সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ৬ ফাল্গুন ১৪২৪
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন স্বপ্ন লাগবে

Published: 2016-08-02 00:00:00

মিজানুর রহমান খানঃ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের জঙ্গিবাদে যুক্ত হওয়ার খবর আমাদের বিচলিত করেছে। কিন্তু এই বিষয়ে ইন্টারনেটে খোঁজখবর নিয়ে যা বোঝা যাচ্ছে, এটাও কমবেশি একটা বৈশ্বিক প্রবণতা।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ ড. স্কট অ্যাট্রান গত বছরের নভেম্বরেই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে অবহিত করেন যে বিদেশি জঙ্গি যোদ্ধাদের ৯৫ শতাংশই পরিবার ও বন্ধুদের মাধ্যমে আইএস নিয়োগ করেছে, তাদের তারা মসজিদ থেকে নেয়নি। ৬৪ বছর বয়স্ক ড. স্কট বহু বছর ধরে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও ধর্ম নিয়ে গবেষণা করছেন। মার্কিন ও ফরাসি নৃতত্ত্ববিদ হিসেবেও তিনি খ্যাতির শিখরে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর দ্য রেজল্যুশন অব ইন্টারেকটেবল কনফ্লিক্ট-এর ফাউন্ডিং ফেলো অধ্যাপক স্কটের এই পর্যবেক্ষণকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।

রোববার এক ই-মেইল বার্তায় ড. স্কটের কাছে জানতে চাইলাম, তিনি যে জরিপের ভিত্তিতে নিয়োগের প্রধান উৎস হিসেবে বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের পেয়েছেন, কোথায় তার প্রকাশ ঘটেছে। উত্তর পেলাম, এই মন্তব্যের ভিত্তি হচ্ছে জরিপ, যা তাঁর টকিং টু দ্য এনিমি: ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজম, স্যাকরেড ভ্যালুজ অ্যান্ড হোয়াট ইট মিনস টু বি হিউম্যান নামের বইয়ে ছাপা আছে। তবে লক্ষণীয় হলো, সেটি ২০১০ সালে বেরিয়েছে। আর আইএস কথাটি এসেছে ২০১৪ সালে। আইএস নাম নতুন হলেও পবিত্র ধর্মের নাম ব্যবহার করে সালাফি ও ওয়াহাবিবাদনির্ভর সন্ত্রাসবাদ আইএস রূপকাররা জামাত আল তাওহিদ আল জিহাদ নামে ১৯৯৯ সালেই শুরু করেছিল। ২০০৪ সালে এরাই আল-কায়েদায় যোগ দিয়েছিল। সুতরাং এটা খুবই স্পষ্ট যে কোনো নির্দিষ্ট নাম ধারণ করল কি করল না, তার থেকে বড়, সন্ত্রাস বাড়ছে না কমছে।

তবে আমাদের জাতীয় জীবনে যখন বিপর্যয় নামে, বিশেষ করে তার ধরনটা রাজনৈতিক ধাঁচের হয়, তখন আমার পাকিস্তানের কথা মনে পড়ে। এবং প্রায়ই তার সঙ্গে মিল খুঁজে পাই। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। পশ্চিমা দুনিয়াতেও ক্যাম্পাসে জঙ্গি-জীবাণুর সংক্রমণ ঘটেছে কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে এমন একটি মিল আছে, যা সম্ভবত বিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তে পাওয়া যাবে না। সেটা হলো, গোড়াতে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় টার্গেট হয়েছে। এখানে যেমন টার্গেট মনে হচ্ছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ওখানে তেমনই মুলতানের বাহাউদ্দিন জাকারিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। পাকিস্তানি গোয়েন্দারা ২০১৪ থেকে চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারিতে রেখেছেন ৩৫ হাজার ছাত্রসংবলিত ওই বিদ্যাপীঠকে।

পাকিস্তানি গবেষক হুমা ইউসুফ গত ফেব্রুয়ারিতে এক নিবন্ধে উল্লেখ করেন, করাচির একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, জঙ্গি নিয়োগকারীরা শিক্ষিত মধ্যবিত্তকে টার্গেট করেছে। ‘বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাডিক্যালাইজেশন, পাকিস্তানের সন্ত্রাস দমনের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক ওই নিবন্ধ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কমব্যাট টেররিজম সেন্টার। এতে দেখা যায়, উগ্রপন্থী সন্দেহে যারা ক্যাম্পাস থেকে গ্রেপ্তার হচ্ছে, তাদের অনেকে স্থানীয় জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড ছিলেন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে এখন সন্দেহভাজন জঙ্গি আখড়া মনে করা হয়। ২০১৩ সালে কট্টর ভারতবিরোধী লস্কর-ই-তাইয়েবার জঙ্গিদেরও উচ্চশিক্ষিত পাওয়া গেছে। ৬৩ শতাংশ মাধ্যমিক আর কতিপয়কে ডিগ্রির ছাত্র পাওয়া গেছে। পাকিস্তানের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাওয়ালপিন্ডির আরেকটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নাস্ট) ছাত্ররাও জঙ্গি হয়েছেন। করাচির দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই স্নাতককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এই অভিযোগ যে তাঁরা আল-কায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার ওয়েবসাইট পরিচালনা করছিলেন। এই সংগঠনটির ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশও তাদের নজরে রয়েছে। কিন্তু করাচিতে আল-কায়েদা-অনুপ্রাণিত একাধিক সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে অন্যতম সন্দেহভাজন হলেন করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী।

আরেক জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি লেখক, সম্প্রতি মস্কোতে সাক্ষাৎকালে যিনি আমাকে বলেছিলেন, একাত্তরের মার্চের নৃশংসতার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ করে তিনি অন্তরীণ হয়েছিলেন, তিনি কিছুদিন আগে ডন-এ একটি নিবন্ধ লিখেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলাকারীরা যেভাবে সচ্ছল পরিবারের, সেভাবে করাচির একটি বাসে হামলাকারীরাও সচ্ছল পরিবারের ছিল। ওয়াশিংটনভিত্তিক উড্রো উইলসন সেন্টারের ফেলো হুমা ইউসুফের আরেকটি পর্যবেক্ষণ হলো, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের মধ্যে উগ্রবাদে ঝোঁক বাড়ছে, কারণ সাম্প্রতিক কালে জামায়াত-ই-ইসলামি ও জামায়াত উলেমা উল ইসলাম যাদের ক্যাম্পাসে জোরালো সংগঠন আছে, তারা উগ্রপন্থা অবলম্বনে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। জামায়াতের অঙ্গসংগঠন তুলাবা (যা এখানে ছাত্রশিবির) ক্যাম্পাসে সহিংসতা বাড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রাখাকেও তিনি ক্যাম্পাস র‍্যাডিক্যালাইজেশনের জন্য দায়ী করেন। বাংলাদেশেও আমরা ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রেখেছি। এটা চালু করে ক্যাম্পাসে মুক্ত বাতাস বইতে দিতে হবে। অভ্যন্তরীণ দোষারোপ ও বাদানুবাদের ঊর্ধ্বে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে উগ্রতামুক্ত করতে একটি নিষ্কলুষ রণকৌশল নিতে হবে, যার মূলে থাকবে ছাত্রদের জন্য স্বপ্ন দেখানো। এমন স্বপ্ন যা জঙ্গিবাদী স্বপ্নকে পরাস্ত করে। তাঁদের সামনে একটি টানাপোড়েনমুক্ত উন্নত জীবনের ছবি আঁকতে হবে, যা তাঁদের আত্মঘাতী হতে দেবে না।

ড. স্কটের দাবি অনুযায়ী আইএস যদি একটা ‘উন্মাদনার’ অংশ হয়ে থাকে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় সেই আলোকমালা, যেখানে
পতঙ্গ ধেয়ে যাবে। সুতরাং ক্যাম্পাস র‍্যাডিক্যালাইজেশন রোধ করাটাই এই মুহূর্তে আমাদের রাষ্ট্রের জন্য বৃহত্তম চ্যালেঞ্জ।

লেখকঃ মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷

mrkhanbd@gmail.com

 

 

 

 

ঢাকা, ২ আগস্ট/ আমার ক্যাম্পাস/ এ এম