বৃহস্পতিবার, ২৪ মে ২০১৮, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

ভাসানীকে মাসে কুড়ি হাজার, সবুর খান ও শাহ আজিজকে মুক্তি দেন বঙ্গবন্ধু

Published: 2016-08-17 00:00:00

শনিবার। ১০ সেপ্টেম্বর ২০০৫। শরতের সকাল। আকাশে রোদের সঙ্গে মেঘের খেলা চলছিল। বৃষ্টি নামলো বিকালে। শনিবার ফের সরকারি ছুটির তালিকায়। রাস্তাঘাট ফাঁকা। ১০টায় যাবার কথা ছিল ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থানের নায়ক তোফায়েল আহমেদের বাসভবনে। যেতে যেতে ১১টা। তিনি ১৪ দলের বৈঠকে যোগ দিতে যাবেন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। সময় মতো কোনও কর্মসূচিতে যোগ দেয়া তার নিয়মে বাঁধা। বললেন, ১০টায় আসার কথা, এত দেরি কেন?

আগেই বলেছিলাম শুধুই আড্ডা দিতে আসব। পেশার তারে জড়ানো জীবনে অফডেতেও বরেণ্য রাজনীতিবিদের সঙ্গে তাদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে আড্ডা দেয়া নিয়মে বাঁধা ছিলো। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, মরহুম আব্দুস সামাদ আজাদ, মিজানুর রহমান চৌধুরী, স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী অনত্যম। অনেক আড্ডা দিয়েছি মরহুম কাজী জাফর আহমদের সঙ্গে। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আর আড্ডা তো সমার্থক শব্দ। এখনো নিয়মিত আড্ডা দেই।

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দু-চার কথা বলার পর তোফায়েল আহমেদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, স্বাধীধনতার পর দালাল আইনে কারাবন্দি মুসলিম লীগ নেতা সবুর খানের মুক্তির পুরো বিষয়টি জানতে চাই। তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘মুসলিম লীগ রাজনীতিতে ফজলুল কাদের চৌধুরী, সবুর খানরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বয়সে শুধু সিনিয়রই নন, ঘনিষ্ঠও ছিলেন। স্বাধীনতার বিরোধিতা করে তারা তখণ কারাগারে। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার স্বাধীন বাংলার স্থপতি ও প্রধানমন্ত্রী।’ ওই সময় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। তোফায়েলকে হাতে ধরিয়ে দিলেন কারাগার থেকে পাঠানো সবুর খানের চিঠি। চিঠিতে চোখ রেখেই চমকে ওঠেন। সবুর খান কয়েক ছত্রের চিঠিতে জাতির জনকের কাছে বন্দি জীবনের অবসান চেয়েছেন। তিনি লিখেছেন-
‘আমার স্নেহের মুজিব, আমার অনেক অনেক স্নেহ ও দোয়া নিও। যে বাংলাদেশের স্বপ্ন তুমি দেখেছিলে সে বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। আর তুমিই হয়েছো সে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ভাবতে আমার কতোই না ভালো লাগে। কিন্তু কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে আমি যখন ভাবি যে, বাংলার প্রধানমন্ত্রী আমর প্রিয় মুজিব; সেই বাংলার বৃদ্ধ সবুর খান আজও কেন কারাগারে? আমি তার উত্তর খুঁজে পাই না। চিঠি পড়া শেষ হতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডাকলেন তার পিএস মশিউর রহমানকে। বললেন, ‘আমি সবুর খানকে এখনই মুক্তি দিতে চাই।’ মশিউর বললেন, ‘স্যার মুক্তির জন্য কিছু আইনি বাধ্যবাধকতা শেষ করতে হবে।’ তিনি তাই করার নির্দেশ দিলেন। চিরচেনা পাইপে এরিনমোরের ধোঁয়া ছুঁড়ে বঙ্গবন্ধু যেন অস্থির হয়ে উঠলেন। অনন্য সাধারণ তার রাজনৈতিক সংস্কৃতি! তোফায়েল আহমেদকে বললেন, ‘কারাগার থেকে সবুর ভাইকে ঘরে পৌঁছে দেবে।’ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সবুর খানের কারামুক্তির দ্রুত ব্যবস্থা করা হল। কারামুক্ত সবুর খানকে ঘরে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বটি তোফায়েল আহমেদের এপিএস শফিকুল আলম মিন্টু নেন। মিন্টু কারা গেট থেকে ধানমণ্ডির ২৫ নম্বর বাড়িতে পৌঁছে দেন সবুর খানকে। তোফায়েল আহমেদের কথায় উঠে আসে ইতহিাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর অনালোকিত এক মানবিক মুখচ্ছবি। কী বিশালই না ছিল আকাশ ছোঁয়া উচ্চতায় থাকা বঙ্গবন্ধুর হৃদয়। বিশাল ছিল তার হৃদয়ের সিংহদরোজা। অতিসাধারণ মানুষ কড়া নাড়লেই তা খুলে যেত। যেমন পৌরুষদীপ্ত ছিলো তার বিশাল দেহ, ব্যক্তিত্বের দ্যুতি, অমিত সাহস। তার চেয়ে বড় ছিলো হৃদয় খানি। যেন সমুদ্রের বিশাল গভীরতা পাওয়া যায়, বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ের সীমাহীন গভীরতা পাওয়া যায় না। হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায়’। বুকভরা ছিল তার ভালবাসা। কৃতজ্ঞতা বোধ ছিল সব প্রশ্নেরই উর্ধ্বে। তাকে কাছে থেকে দেখা মানে আকাশ ও সমুদ্র এক সঙ্গে পাওয়া। বিশাল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন বলেই আরেক বন্ধু শাহ আজিজুর রহমানকে কারাগার থেকে শুধু মুক্ত করেই দেননি, চলাফেরার জন্য দিয়েছিলেন, ‘ভক্সএল বিভা’ গাড়ি। তোফায়েল আহমেদ বলতে রাজি হননি, তবে অন্য সূত্র বলেছে, কারাবন্দি থাকাকালে শাহ আজিজের পরিবারকে জাতির জনক প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা পাঠাতেন। এক সকালে তোফায়েল আহমেদকে ডেকে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘অসম্ভব। এভাবে চলতে পারে না। একটা মানুষ জেলে থাকবে, তার পরিবার থাকবে অসহায়। আর প্রতিমাসে সাহায্য করে যাওয়া এমনটি আমার পক্ষে সম্ভব নায়।’ সবার বুঝতে বাকি থাকল না যে তিনি আসলে শাহ আজিজকে মুক্তি দিতে চান। তাই এই নাটকীয়তার সূচনা।

এক নেতা বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু ফজলুল কাদের চৌধুরী, সবুর খানদের কারাগারে না রাখলে যুদ্ধ ফেরা, উত্তেজনায় উল্লসিত মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে মৌলভী ফরিদ উদ্দীন আহমেদের মতো জীবন দিতে হত এদের।
কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহার নামে হুলিয়া। পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। এমনি এক টালমাটাল রাজনৈতিক আবহাওয়ার ভিতর স্বাধীনতার সূতিকাগার ধানমণ্ডির বাড়িটির তিনতলার রুমে তিনি বসে আছেন বঙ্গবন্ধুর মুখোমুখি। মাথায় টুপি শোভিত ছদ্মবেশী চীনাপন্থি কমিউনিস্ট তোয়াহা বঙ্গবন্ধুর উষ্ণ আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে খোশ গল্প করছেন। এমন দৃশ্যের মুখোমুখি হওয়ায় বিব্রত বঙ্গবন্ধু তোফায়েলকে বলেন, ‘তুমি এখানে কেন এসেছ? অবাক হয়ে বেরিয়ে আসেন তোফায়েল।
‘৭১ সালের অগ্নিঝরা উত্তাল মার্চের অসহযোগ আন্দোলন তখন চলছে। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খানের শাসন অচল হয়ে পড়েছে। জনগণের একমাত্র নেতা তখন বঙ্গবন্ধু। তার অঙ্গুলি হেলনে চলছে সমগ্র পূর্ববাংলা। প্রতিদিন বানের স্রোতের মতো বিক্ষুব্ধ বাংলার জনতা নেতার নির্দেশ শুনতে ছুটে আসত ৩২ নম্বরের বাড়িতে। তাদের কণ্ঠে থাকত হাজার বছরের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে আসা দুটি শব্দের এক অমোঘ উচ্চারণ- ‘জয় বাংলা’। মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন আর নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সশস্ত্র বিপ্লবের সমন্বয় ঘটিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ ও নেতাজীর সশস্ত্র বিপ্লব ব্যর্থ হলেও বঙ্গবন্ধুর হাতে দুটোই সাফল্য পেয়েছিল। ইতিহাস বলে, ব্যালটে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন নিয়ে জাতির মহায়নক এতটাই দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আন্দোলন গতিময় করলেন, এতটাই আপোসহীন থাকলেন যে, ৬ দফার ভিত্তিতে একদিন বাঙালির সশস্ত্র যুদ্ধের পরিণতিতে অর্জিত হল স্বাধীনতা। তিনি হলেন স্বাধীনতার নায়ক। তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলার সুযোগই পায়নি স্বৈরশাসকেরা। আর ৭ মার্চের ভাষণটি তখনই দিলেন যখন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির হৃদয় একই সূত্রে গেঁথেছিলেন। ওই সময়ে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো/পূর্ববাংলা স্বাধীন করো’- এই শ্লোগানে বঙ্গবন্ধুকে সামনে রেখে পুরো জাতি স্বাধীনতার মন্ত্রে উত্তাল। রমনা রেসকোর্স ময়দানে বজ্রচেরা কণ্ঠে স্বাধীনতার মহাকাব্য যখন উচ্চারিত হলো তখনই ঘরে ঘরে স্বাধীনতার বার্তা পৌঁছে গেছে। নগর থেকে গ্রামে বাড়ি বাড়ি শেখ মুজিবের ডাকে উড়ল স্বাধীন বাংলার পতাকা। এমনি টালমাটাল সময়ে একদিন ফজলুল কাদের চৌধুরী এসে বত্রিশ নম্বর রোডের বাড়িটিতে প্রবেশ করলেন। তখন বাড়িটি বাঙালি জাতির স্থায়ী ঠিকানায় পরিণত। জাতির বিশ্বাসের তীর্থস্থান। বঙ্গবন্ধু বেরিয়ে এসে মত ও পথের বাইরের মানুষটিকে হাত ধরে গাড়িতে উঠিয়ে বিদায় জানালেন। নেতার উদারতা, মত ও পথের মিল না থাকা সত্ত্বেও রাজনীতিবিদদের প্রতি, সিনিয়রের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও দু:সময়ের বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা, মানুষকে হৃদয় উজাড় করে ভালবাসার হাজারো স্মৃতিময় ঘটনা এখনও ভাস্বর।

এমনকি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে আতাউর রহমান খান যখনই আসতেন, চেয়ার থেকে উঠে এসে জাতির জনক তাকে অভ্যর্থনা জানাতেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হওয়া সত্ত্বেও সবুর খানের মতো মুসলিমলীগ নেতাকে বঙ্গবন্ধু ‘সবুর ভাই’ সম্বোধন করে বক্তৃতা শুরু করতেন। আইয়ুব খানের মার্শাল’ল জামানায় বঙ্গবন্ধু ও সবুর খান একই সঙ্গে কারাগারে। সামরিক শাসক আইয়ুব খানের কারাগারে বঙ্গবন্ধুকে সবুর থান বলছেন, ‘মুজিব এই পাকিস্তান আমাদের জন্য হয়নি’। পরবর্তীতে সামরিক জান্তা আইয়ুবের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করায় সবুর খানের সাজা মওকুফ হয়ে যায়। সবুর খান আইয়ুবের মন্ত্রিত্ব গ্রহণের পর পল্টনের জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলছেন, ‘সবুর ভাই, কারাগারে ডোরাকাটা জামা গায়ে আপনি আমায় বলেছিলেন, ‘এই পাকিস্তান আমাদের জন্য নয়। আজ আপনি আমাকে ও আওয়ামী লীগের সমালোচনা করেন।’ কী অসাধারণ ভালবাসা ছিল বঙ্গবন্ধুর। সম্ভ্রান্ত হলে আপনি সম্বোধন করতেন প্রতিপক্ষ অগ্রজকে বক্তৃতার মঞ্চে! তাই তো মৃত্যুর আগেও সবুর খান তাকে নিয়ে কখনও কটাক্ষ করেননি। আর ৭৯ সালের সংসদে সংসদনেতা হয়ে শাহ আজিজুর রহমান বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় বলেছিলেন, আপনারা শেখ মুজিবের শাসনামলের সমালোচনা করুন। বাকশালের নিন্দা করুন। কিন্তু শেখ মুজিবকে কটাক্ষ বা ছোট করে কোন বক্তব্য রাখবেন না।
বঙ্গবন্ধু সব সময় বলতেন, কখনও কারও জন্য যদি কিছু করো তবে তা গোপন রাখবে। বঙ্গবন্ধুর গোপন সহযোগীতার তালিকায় একবার তোফায়েল আহমেদ মাওলানা ভাসানী লেখায় তিরস্কৃতি হয়েছিলেন। পরে কোড নাম ‘এমভি’ লিখতেন। প্রতিমাসের শুরুতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে কড়ি হাজার টাকা নিয়ে পুলিশের আইজিপি মরহুম ই এ চৌধুরী মাওলানা ভাসানীর কাছে যেতেন। ভিন্নপথের রাজনৈতিক নেতাদের জন্যও অগাধ ভালবাসা ছিল বঙ্গবন্ধুর। এই তথ্যটি আমি সিলেট কানেকশনে পেয়েছিলাম। তিনিই ভাসানীর হাতে টাকা দিয়ে আসার দায়িত্ব পালন করতেন।
আজকের রাজনীতির ক্যানভাসে তাকালে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোথাও পাওয়া যায় না। না দলে, না বাইরে।
বঙ্গবন্ধু যেখানেই যেতেন তার কর্মীদের বড় করে তুলে ধরতেন। অন্যকে বড় করে নিজেও বড় হতেন। কাউকে ছোট করে কথা বলতেন না। গ্রামের লুঙ্গি পরা কর্মীর নামটিও তিনি মুখস্ত রাখেতেন।

বঙ্গবন্ধুর কাছে কেউ সাহায্যর জন্য এলে খালি হাত ফিরতেন না। তার একটি তদবির থাকত তোফায়েল আহমেদের হাতে আরেকটি মোহাম্মদ হানিফের হাতে। একদিন তোফায়েলকে দেখে বঙ্গবন্ধু বললেন, মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা এ লোকটিকে কিছু নগদ অর্থ দিয়ে দাও। তোফায়েল বললেন, এই লোকটিকে না কয়েকদিন আগে সাহায্য করেছেন! তিনি সঙ্গে সঙ্গে লোকটিকে বললেন, তুমি না কয়েকদিন আগে নিয়েছো? যাও যাও। তোফায়েলকে বিদায় করে লোকটিকে আবার ডাকলেন। খবর দিলেন হানিফকে বললেন, লোকটিকে দেড় হাজার টাকা দাও। তবে তোফায়েলকে বলবা না। প্রতি শুক্রবার সাধারণ মানুষ সাহায্যর জন্য আসত তার কাছে। তিনি কাউকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না। একদিন জুমার নামাজে যেতে গাড়িতে উঠবেন এমন সময় এক মহিলা স্বামী নিয়ে এসে বলল, ময়মনসিংহ থেকে এসেছি। সাহায্য করতে হবে।
তোফায়েলকে সাহায্য করার নির্দেশ দিলে তিনি বললেন, এখন একজনকে দিলে সবাইকে দিতে হবে। গাড়ি ছুটে চলল। কিন্তু অসহায় মহিলার মুখটি বঙ্গবন্ধুকে অশান্ত করে রাখল। পরদিন সকালে বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির বাড়িতে গেলে বেগম মুজিব তোফায়েল আহমেদের কাছে জানতে চাইলেন, কাল শুক্রবার কি হয়েছিল? বঙ্গবন্ধু সারারাত ঘুমাতে পারেন নি। ছটফট আশান্তি করেছেন। জানতে চাইলে বলেছেন, তোফায়েলের জন্য একটি অসহায় মহিলার হাত ফিরিয়ে দিতে হলো। প্রতিদিন সকাল ৯টায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তোফায়েল যেতেন গণভবনে। পরদিন গণভবনে সেই অসহায় পরিবারটিকে দেখে তোফায়েল জানান বঙ্গবন্ধুকে। খুশি হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু। স্বামীসহ সেই মহিলাটিকে ডাকা হল। গণভবনের খোলা বারান্দার সোফায় তাদের বসানো হল। তাদের সমস্যার কথা তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তিন হাজার টাকা তাদের দিতে বললেন। টাকা দেয়া হলে মহিলাকে বললেন, মেয়ের বিয়ের জন্য এটা লুকিয়ে রাখবা। একেবারেই ধরবানা। তোফায়েলকে বললেন, ভাড়াটা আলাদা দাও। তাই দেয়া হল। বললেন, এটা পথে যেতে যেতে খরচ করবা। ওটাতে হাত দিবানা। নাটোর সফরে গিয়ে মুসলিম লীগের কর্মী মধু মিয়ার খোঁজ করলেন। স্বাধীনতার বিরোধীতা করায় মধু মিয়া তখন কারাগারে। তার সঙ্গে দুপুরে খেলেন। বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, তার মুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন কর। ৭০ সালে মিরপুর থেকে নির্বাচিত এম এন এ জহির উদ্দিন স্বাধীনতার বিরোধীতা করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর তাকে খুব মনে পড়ে। রাজনৈতিক দু:সময়ে জহির উদ্দিন বঙ্গবন্ধুকে নানা পরামর্শ দিতেন। একদিন সঙ্গীদের বললেন, তোরা যদি কিছু মনে না করিস তাহলে আমি জহির উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করব। জহির উদ্দিনকে তার বাড়িতে গিয়ে দেখে আসলেন বঙ্গবন্ধু।

রাও ফরমান আলীর বইয়ে বিহারের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক চিরকুমার সৈয়দ মুজতবা হাসান খানের কথা আছে। ইস্টার্ন রোডে তার বাড়ি ছিল। বিহারী হলেও বঙ্গবন্ধুকে সাহায্য করতেন স্বাধীনতা সংগ্রামে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে তার বাড়িতে মাঝেমধ্যে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতার শেষ চেষ্টা করতে বৈঠকে বসতেন। জেনারেল হামিদ, জেনারেল মিট্টাসহ আসতেন সামরিক জান্তার প্রতিনিধিরা। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গেলেও তোফায়েল বৈঠকে বসতেন না। কাছাকাছি থাকতেন। এক রাতে শুনতে পান বাঙালির ভালবাসায় সিক্ত, বিশ্বস্ত নেতা শেখ মুজিব রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করছেন ‘আমি আমার জনগণের কাছে ওয়াদাবদ্ধ। তোমরা কী চিন্তা করো। আমার জীবন থাকতে ৬ দফার প্রশ্নে আপস করব না।’ স্বাধীনতার পর সৈয়দ মুজতবা খানকে একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেয়ার প্রস্তাব দিলেও তিনি নেননি। কিন্তু একদিন শ্রমিকদের হামলায় আহত হয়ে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ভর্তি হন। শুনে চিৎকার করে উঠলেন বঙ্গবন্ধু- ‘আম যে দেশের প্রধানমন্ত্রী সে দেশে আমার দু:সময়ের সঙ্গী মানুষটিকে কারা হামলা করল? বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গে হলি ফ্যামিলিতে ছুটে গিয়ে মুজতবা হাসানের পাশে দাঁড়ান।
লেখক, প্রধান সম্পাকদ: পীর হাবিবুর রহমান
Email: peerhabib.rahman@gmail.com

 

 

 

 

ঢাকা, ১৭ আগস্ট/ আমার ক্যাম্পাস/ এ এম