রবিবার, ২৭ মে ২০১৮, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

যে গল্প শ্রম, ধৈর্য ও সফলতার

Published: 2016-08-24 00:00:00

সোনালী সেনঃ ৩ রা জুন ২০১২ । এক বুক আশা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে দুরু দুরু পদে বাংলাদেশ পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার পদে যোগদান করতে আসা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চৌকাঠ পেরোনো এই আমি। যার চৌদ্দ পুরুষের কেউ কখনো থানার চৌকাঠটি পর্যন্ত মাড়ায়নি। শান্ত সরোবরের মত নিস্তরঙ্গ মধ্যবিত্ত হিন্দু পরিবারে জন্ম আমার। নির্ভেজাল ঝুকিবিহীন শান্তিপ্রিয় সহাবস্থানই ছিল মূল প্রতিপাদ্য।

সেখান থেকে পুলিশের মত ঝুকিবহূল পরিশ্রমসাধ্য পেশা বেছে নেওয়া রীতিমত দু:সাহস। বড় বন্ধুর ছিল সেই পথচলা। মফস্বল শহরের নিছক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপত্রকে অবলম্বন করে দেড় লক্ষাধিক প্রতিযোগীর সাথে যুদ্ধে ঊত্তীর্ণ হতে হয়েছে।

ছোটবেলা থেকে একাডেমিক পডাশোনাটা কখনও ভাল লাগেনি। তাই গায়ে ভাল ছাত্রের তকমা ছিল না। ছিল প্রচুর বই পড়ার নেশা। সামনে যা পেতাম গোগ্রাসে পড়তাম । জ্যাঠামশাই নাম দিয়েছিলেন শান্ত সুবোধ পাঠিকা। ভাইবোনেরা ক্ষ্যাপাত। পরবর্তীতে বিসিএস যুদ্ধে এ অস্ত্রটি ব্যাপক কাজে দিয়েছিল।

২৮, ২৯ ,৩০ তিন তিনবার বিসিএস ভাইভাবোর্ড দর্শনের সুযোগ হয়েছে। প্রতিবারেই পুলিশ প্রথম পছন্দ। এর মধ্যে তৃতীয় তম সরকারী চাকুরী হিসাবে উপজেলা শিক্ষা অফিসার পদে কাজ করছি। ২৮ তম বিসিএস ভাইভাবোর্ডে চরম অবজ্ঞা যখন আত্মবিশ্বাস চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়েছিলো । তখন পাশে ছিল আমার বন্ধু আমার উপদে্ষ্টা , আমার বাবা। সেই সময় অনেকেই বলত , আরে টাকা ছাড়া চাকরী হয় নাকি! হয় টাকা না হয় রাজনৈতিক জোর, যার কোনটিই ছিলনা আমার।ছিল শুধু একরাশ স্বপ্ন। বাবার স্বপ্ন একদিন মেয়েকে চিনবে সারা বাংলাদেশ ।

ফলাফল প্রকাশ হল বড় দেরিতে,আমার সকল অনুভূতির সস্ত্যায়নের পরদিন। মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ আগেও পিএসসি র ওয়েব সাইটে নোটিশ সার্চ করেছিলেন বাবা।

আজ পূর্ণ হল বাংলাদেশ পুলিশে যোগদানের চতুর্থ বৎসর। বিগত চার বছর চেষ্টা করেছি বাবার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে। যখন যে পোস্টিং এ থেকেছি সেই অবস্থান থেকে চেষ্টা করেছি মানুষের কাছাকাছি পৌঁছাতে।

কতটা পেরেছি জানিনা কিন্তু ভাললাগে যখন কেউ কোন সমস্যার কথা বললে সেটার সমাধান করতে পারি। ভাললাগে যখন সাতক্ষীরার প্রত্যনত শ্যামনগর থানার বাসিন্দা আসমা বেগম সমস্যার কথা বলতে আমার কাছে ছুটে আসে। চট্টগ্রামের হাটহাজরীর সীমারানিরা ইনবক্সে পারিবারিক নির্যাতনের কথা জানায়। ভাললাগে কনা কনা আত্মবিশ্বাস ছডিয়ে দিতে আসমা- সীমা রানীদের মাঝে।

ভাললাগে যখন আমার চিরকালের ভয় পাওয়া মা আমাকে অবলম্বন করে ভরসা পাওয়ার চেষ্টা করে । যে মেয়েটি সন্ধ্যার পর একমুহুর্ত বাইরে থাকলে উৎকন্ঠায় মায়ের হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হত , সেই মেয়েটি যখন রাত ভোর রাউন্ড শেষে বাড়ি ফেরে অসীম মমতায় মা দরজা খুলে দেয়।
ভাললাগে যখন ক্যান্সার আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রী কং শাহীন সূদূর প্রবাস থেকে ফোন করে আমার জন্য প্রার্থনা করে।

সময়ের পরিক্রমায় সিনিয়র এ এস পি মর্যাদা পেতে যাচ্ছি। এতে আমার কৃতিত্ব নাই ।পরবর্তী পথচলা হয়ত খুব মসৃন নয়। তবু সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি , কোন রকম পৃষঠপোষকতা ছাড়া যেমন নিজের যোগ্যতায় চাকরিতে যোগদান করতে পেরেছি, তেমনি সকল প্রতিবন্ধকতায় যেন নিজের আত্মবিশ্বাস থেকে কখনও বিচ্যুত না হই।

লেখক: সোনালী সেন
এ এস পি, বাংলাদেশ পুলিশ।

(ফেসবুক থেকে সংগ্রহ)