শনিবার, ২৬ মে ২০১৮, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

দানবের হুঙ্কারে মানবের দীর্ঘশ্বাস

Published: 2016-08-25 00:00:00

ফরিদুল আলমঃ একদিকে জঙ্গিবিরোধী সর্বস্তরের মানুষের অবস্থান আর অন্যদিকে গুটিকয় বিপথগামী তরুণদের সংগঠিত করে তাদের দিয়ে একের পর এক জঙ্গি হামলার চিত্র উদ্বেগজনক। গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র তার সর্বশক্তি দিয়েও পরাস্ত করতে পারছে না মানবতার শত্রু এসব জঙ্গিকে।

দানবের হুঙ্কারে বারবার মানবের দীর্ঘশ্বাস এটাই এখন এক দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের জীবনে। এক এক করে মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হয়েছেন অনেক মুখ। জীবনমুখী এই মানুষগুলোকে জীবনের সজীব নির্যাস থেকে বঞ্চিত করল যারা তারা সংখ্যায় এত অল্প হওয়া সত্ত্বেও আমাদের লড়াই চলছে এখনো। এখনো আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে তাদের দুর্গে প্রলয় আঘাতের পরিবর্তে আমরাই বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছি। মাঝে মধ্যে হতাশার চাদরে নিজেদের আবৃত করে কষ্টের সঙ্গে উচ্চারণ করছি ‘বিচার চাই না, শুভবুদ্ধির উদয় হোক’ এ যেন অনেকটা তাদের কাছে আত্মসমর্পণের মতো, নিজেদের আর কিছুই করার নেই মনে করে কেবল সৃষ্টিকর্তার অনুকম্পা চাওয়ার মতোই। তারপরই আবারো সম্বিৎ ফিরে পেয়ে আবারো ঝাঁপিয়ে পড়া, প্রগতিশীল চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে জঙ্গি এবং সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠনের দৃপ্ত শপথে বলিয়ান হয়ে পথ চলা। এ যেন এক নিরন্তর সংগ্রাম, অনাদিকাল থেকে চলে আসা এক যুদ্ধ, যা চলতে থাকবে অনন্তকাল পর্যন্ত। সত্যিই তাই, সুন্দরের সঙ্গে অসুন্দরের বিবাদ তো সেই সৃষ্টির সূচনা থেকেই, সুন্দর, সার্বজনীন। শাশ্বত। সুন্দর মানে আলো, যার পেছনে প্রায় সবাই ঘূর্ণায়মান, যা কাক্সিক্ষত। আর যারা অসুন্দরের পেছনে ঘূর্ণায়মান তাদের কাছে অসুন্দরই সুন্দর এবং সত্য। কোনো সত্য অধিক সত্য সেই প্রশ্নের একটাই উত্তর, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’ আর তাই মানুষের ওপর এবং মানবতার ওপর যখন আঘাত আসে, সে আঘাত সত্য এবং সুন্দরের বিনাশী তৎপরতা ভিন্ন আর কিছু হতে পারে না।

এ কথা যেমন অস্বীকারের সুযোগ নেই যে ন্যায়ের সঙ্গে অন্যায়ের সংঘাত চিরায়ত, তেমনি এমনটাও ভাবার কোনো অবকাশ নেই যে, ন্যায়ের সঙ্গে অন্যায়ের কোনো আপস চলতে পারে। যা সুন্দর, সার্বজনীন এবং শাশ্বত তা আজ ক্রমান্বয়ে আমাদের কাছে সুদূরপরাহত। মাঝে মধ্যে মনে হয় গুটিকয় নষ্ট লোকের কাছে জিম্মি বৃহত্তর মানবতা। দেশে ঘটে যাওয়া এবং ঘটতে থাকা অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনা এবং ঘটনা-দুর্ঘটনা পরবর্তী ঘটনাক্রমগুলো আমাদের প্রত্যাশার সঙ্গে ভীষণরকম বৈপরীত্যের সাক্ষ্য বহন করে, যা আমাদের ভালো থাকা এবং শুভচিন্তাকে প্রতিনিয়ত আঘাত করে। অন্যায়ের সঙ্গে ন্যায়ের পার্থক্য তখনই স্পষ্ট হবে যখন যৌক্তিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে অন্যায়কে বিনাশ করা যাবে। এর বিনাশে দীর্ঘসূত্রতা এবং সময়ক্ষেপণ এ ধরনের অপরাধকে লালন করারই নামান্তর। বাংলাদেশে জঙ্গি কর্মকাণ্ডের অভিযোগের দায়ে দোষী সাব্যস্ত জেএমবির ৬ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর এ রকম অনেক অপরাধী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা আটক এবং বন্দি হলেও আজ পর্যন্ত তাদের কোনো সদস্যের দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়া প্রকারান্তরে এ ধরনের অপরাধীদের ক্ষেত্রে বিচারহীনতার একধরনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা তাদের কর্মকাণ্ডকে বর্তমানে অনেক বেশি প্রসারিত করতে ভূমিকা পালন করেছে। একসময়ের ধ্বংসপ্রাপ্ত কিংবা প্রায় নির্মূল হওয়া জেএমবিতে আজ আবার নতুন করে প্রাণসঞ্চারিত হয়েছে, যা খোদ সরকারের বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট।

গুলশান এবং শুলাকিয়ায় জঙ্গি হামলাকারীরা সরকারের ভাষায় জেএমবির সদস্য, এর মধ্য দিয়ে কি এক কথায় এটাও প্রমাণিত হয় না যে দেশের সরকার ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকা অবস্থায়ও প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া একটি সংগঠনের পুনর্জাগরণ এ ধরনের সংগঠন এবং তাদের অনুসারীদের সরকার এবং তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেয়েও আরো অধিকভাবে সংগঠিত করেছে? কেবল জেএমবি কেন, হুজি, হিযবুত তাহরীর মতো সংগঠনগুলো আবার নতুন করে সংগঠিত হওয়ার পাশাপাশি আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি)সহ নতুন নামে অনেক নতুন নতুন সংগঠনের জš§, বিকাশ এবং নানামুখী কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাদের বিস্তার আমাদের বিদ্যমান শাসনব্যবস্থার বহুমুখী ক্ষতগুলোকে বারবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া সত্ত্বেও আমরা বাস্তবে কতটুকু সচেতন হতে পেরেছি তা আজ গভীরভাবে ভেবে দেখা প্রয়োজন। গত ২২ আগস্ট ২০১৬ তারিখে সমকাল পত্রিকার এক প্রতিবেদনে জঙ্গি সংগঠন হুজি আবার কীভাবে সংগঠিত হচ্ছে সে ব্যাপারে বিস্তারিত একটি ধারণা প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদন থেকে যা বোঝা যায় তা হচ্ছে, তারা সুপরিকল্পিতভাবে তাদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে, এমনকি তাদের যেসব নেতাকর্মী জেলখানায় রয়েছে তাদের সঙ্গে সংগঠনের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে, জেলখানায় থাকা এ ধরনের স্পর্শকাতর মামলার আসামিদের সঙ্গে তাদের সংগঠনের কর্মীদের যোগাযোগ এবং সংগঠন পরিচালনায় ভূমিকা রাখা রীতিমতো আতঙ্কের। হুজির প্রতিষ্ঠাতা এবং কারান্তরীণ নেতা মুফতি হান্নান একাধিক মামলায় গ্রেফতার হলেও কোনো মামলারই চূড়ান্ত সমাধান না হওয়াতে এবং সেই সঙ্গে প্রশাসনের শিথিলতায় সহজ-সাবলীলভাবে তার নিয়মিত কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছে। জেএমবি এবং এবিটির মতো সংগঠনের শক্তিবৃদ্ধিতে হুজি নিজেদের শক্তিবৃদ্ধিতে তৎপর হয়েছে বলে জানা গেছে এবং সংগঠনের অপর প্রভাবশালী নেতা খালেদ সাইফুল্লাহ মালয়েশিয়া পালিয়ে গিয়ে সেখান থেকে সংগঠনের সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের পাশাপাশি সংগঠনের কর্মকাণ্ড পরিচালনায় অর্থ সংস্থানের বিষয়টিও তদারকি করছেন। যতই সরকার এবং পুলিশ প্রশাসন দাবি করুক না কেন যে, দেশে সংঘটিত জঙ্গি কর্মকাণ্ডগুলো হোমগ্রন জঙ্গিদেরই কাজ কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, তাদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় প্রয়োজনীয় অর্থ এবং সমর্থন আন্তর্জাতিকভাবে সংস্থান করা হচ্ছে, যেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও একটা ভূমিকা রয়েছে, যার প্রমাণ সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে কয়েক বাংলাদেশির জঙ্গি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার দায়ে শাস্তি হওয়া। এছাড়া জঙ্গি কর্মকাণ্ড পরিচালনায় অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা বড় ভূমিকা রাখছে, যা প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

জঙ্গি দমন এবং প্রতিরোধে আমাদের সরকার তথা পুলিশ প্রশাসনের অতীত এবং বর্তমান সময়ে অনেক ইতিবাচক ভূমিকা থাকলেও এর বিস্তাররোধে তেমন কোনো কর্মকাণ্ড চোখে না পড়া অনেকটা বিস্ময়কর। ২০০৫ সালে সারাদেশে ত্রাস সৃষ্টিকারী জেএমবির সদস্যদের আটক, বিচার এবং বিচারের রায় কার্যকর করে সরকার জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে জঙ্গি দমনে প্রশংসিত হলেও এর পরের সময়গুলোতে অস্বাভাবিকভাবে এর বিস্তার রোধে একইরকম ব্যর্থতা দেখা গেছে। এর অর্থ এই নয় যে, সরকার তাদের ধরতে ব্যর্থ হয়েছে কিংবা সরকারের দক্ষতার কোনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে বরং রহস্যজনকভাবে জঙ্গি এবং জঙ্গিকর্মকাণ্ড সম্পর্কিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রহস্যের অন্তরালে রয়ে গেছে। গতবছর ২৮ নভেম্বর দৈনিক মানবকণ্ঠের একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ, ‘সাম্প্রতিক দেশজুড়ে চাঞ্চল্যকর অধিকাংশ হত্যা ও নাশকতায় জড়িত নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) সদস্যরা। আর জেএমবি ও এবিটির জঙ্গিদের সামনে রেখে প্রায় সব সন্ত্রাসী হামলার কলকাঠি নাড়ছে জামায়াত-শিবিরের কতিপয় নেতা। আশুলিয়ায় প্রকাশ্যে দুর্ধর্ষ ব্যাংক ডাকাতি, হোসেনি দালানে গ্রেনেড হামলা, গাবতলীতে ও আশুলিয়ায় পুলিশ হত্যা, বাড্ডায় পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যানকে হত্যা, পাবনার ঈশ্বরদীতে যাজককে গলা কেটে হত্যাচেষ্টা এবং সর্বশেষ বগুড়ায় শিয়া মসজিদে গুলি করে মুয়াজ্জিনকে হত্যায় সরাসরি জেএমবির দুর্ধর্ষ জঙ্গিরা অংশ নেয় বলে নিশ্চিত হয়েছেন গোয়েন্দারা।’ মানবকণ্ঠের উল্লিখিত প্রতিবেদন অনুযায়ী জেএমবি এবং জামায়াত-শিবিরের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে এসব ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে এবং তারা এ ধরনের হামলা পরিচালনার লক্ষ্যে গড়ে তুলেছে ডেথস্কোয়াড। এর কারণ একটাই জেএমবির শীর্ষ ৬ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর ধরে নেয়া হয়েছিল যে তারা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে, যা একটি ভুল ধারণা ছিল এবং আজকের জামায়াতে ইসলামী যখন নিষিদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এই অবস্থায় তারা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার অভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে এ ধরনের নাশকতায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী আইএসের তৎপরতার সেøাগান এদেশে ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস পাচ্ছে।

গত ২১ আগস্ট ২০১৬ তারিখে পুলিশের পক্ষ থেকে ব্লগার অভিজিতের হত্যা সম্পর্কিত ৭টি ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া ৬ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে সন্দেহ করে তাদের ধরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে সহায়তা চাওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, অভিজিৎ খুন হন গত বছর ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির বইমেলা থেকে বের হওয়ার সময় এবং ভিডিওগুলো দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে, তাকে কতটা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ ফারাবীসহ ৮ জনকে গ্রেফতার করলেও শরিফ ওরফে মুকুল রানা নামে একজন পুলিশের তথাকথিত ক্রসফায়ারে মারা যায়। জানা যায়, শরিফ ছিল জঙ্গি সংগঠন এবিটির সামরিক শাখার প্রধান এবং মূল আসামি। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে পুলিশের কাছে এতদিন ধরে এই ভিডিও ফুটেজগুলো থাকা সত্ত্বেও আজ দেড় বছর পর কেন তা প্রকাশ করে সন্দেহভাজনদের গ্রেফতারে সহায়তা চাওয়া হলো? নানাবিধ ঘটনার আলোকে এই সন্দেহ যদি কারো মনে জাগে যে অভিযুক্তদের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে কিংবা তারা ইতোপূর্বে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তথাকথিত ক্রসফায়ারের নামে প্রাণ হারিয়েছে তাহলে কি তা খুব অস্বাভাবিক মনে হবে? সরকারের জঙ্গি দমন এবং প্রতিরোধে সক্ষমতা রয়েছে এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, কিন্তু একইরকমভাবে তাদের বিচারিক কার্যক্রমের আওতায় আনার ব্যাপারে যে উদাসীনতা দেখা গেছে তাকে আমরা কী বলব? তবে কী সরকারের ভেতরও আরো কোনো শক্তিশালী সরকার কাজ করছে যারা খোদ বর্তমান সরকারপ্রধানের ওপর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট হামলাকারীদের বিচার শেষ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে না? একের পর এক নাশকতার ঘটনা ঘটছে এবং তার সমান্তরালে ঘটে চলছে ক্রসফায়ারের নামে আসামিদের নিহত হওয়ার মতো চির পরিচিত ঘটনা। সরকারের গোয়েন্দাসূত্র এর আগে একাধিকবার নিশ্চিত করেছে দেশের অভ্যন্তরের ইসলামিক গ্রুপগুলো নিষিদ্ধের দ্বারপ্রান্তে উপনীত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসালামীর সহায়তায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। এতকিছুর পরও জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার জন্য আদালতের রায়ের জন্য অপেক্ষা বিষয়টি নিজের দায় অনেকটা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার মতো। ইতোপূর্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একাধিক রায়ে ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার সমালোচনা করে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সংগঠনটি তাদের দায় এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করা হয়েছে। এ ধরনের পর্যবেক্ষণের আলোকে সরকারের নির্বাহী আদেশে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করলে তা কোনোভাবেই আইনের বরখেলাপ হতো না বলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষও তা মনে করি। কেবল বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর মতো যুদ্ধাপরাধী সংগঠন ঐকবদ্ধ বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে সরকারকে একধরনের সুবিধা এনে দেবে এটাই যদি এই সংগঠনের অস্তিত্ব জিইয়ে রাখার একমাত্র কারণ হয়ে থাকে তবে ক্রসফায়ারের মতো ঘটনা ঘটিয়ে জঙ্গি সংগঠনগুলোকে একধরনের দায়মুক্তি দেয়ার মানে কী দাঁড়াতে পারে? সরকারকে গভীরভাবে ভাবতে হবে তাদের ঠাকুরঘরে বসে কেউ কলা খাচ্ছে কিনা।

দেশ এই মুহূর্তে সম্প্রতি সংঘটিত জঙ্গি হামলাগুলো নিয়ে চিন্তিত এবং ভীতসন্ত্রস্ত থাকলেও কার্যত এ ধরনের অপতৎপরতা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামধারণ করে আমাদের সামনে উপস্থিত হয় এবং প্রতিটি ঘটনায় সরকার এবং তার প্রশাসনকে ব্যতিব্যস্ত হতে দেখা যায়। একটি ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি ঘটনার উপস্থিতি আগের ঘটনাকে গুরুত্বহীন করে দেয়। কিছুদিন আগ পর্যন্ত গুপ্তহত্যা এবং গুমের মতো ঘটনা আমাদের ভীষণভাবে ভাবিয়েছে। তারপর সিজার তেভেল্লা এবং কুনিও হুশির মতো বিদেশি নাগরিকদের হত্যা, শিয়া মসজিদে হামলা এবং পুলিশ অফিসার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা মিতু হত্যাকাণ্ড এই সবকিছুকে ভেদ করে সম্প্রতি গুলশান এবং শোলাকিয়ার হামলা। এর পর হয়তো আবার অপেক্ষা নতুন সংস্করণে নতুন কোনো হামলার। এক সময় চাপা পড়ে যাবে গুলশান এবং শোলাকিয়া। হত্যাকারীরা দাপিয়ে বেড়াবে বাংলার মাঠঘাট। রাজনীতিবিদরা ব্যস্ত থাকবেন একে অন্যকে দোষারোপে। এভাবে আর কতদিন? ঘটনার সাক্ষী কেবল আমরা আর ঘটনার নেপথ্যের ঘটনাগুলো চাপা পড়ে থাকে এবং একসময় হারিয়েও যায়। কেবল আমাদের দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে আকাশে-বাতাসে। আর কত এই দীর্ঘশ্বাস?

 

লেখক: শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশ-বিদেশের রাজনীতির বিশ্লেষক