বৃহস্পতিবার, ২৪ মে ২০১৮, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

'ঠেকা সাঈদ'

Published: 2016-09-05 00:00:00

পলাশ মাহবুব

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমাদের এক সহপাঠী ছিল, সাঈদ। আমরা ডাকতাম 'ঠেকা সাঈদ'। কারণ পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা সে 'ঠেকা' দিয়ে পার করেছে। একজনের প্যান্ট পরে তো আরেকজনের শার্ট। সাবান-শ্যাম্পু তো নিজের ছিলই না। মাঝে মাঝে অন্যের টুথব্রাশ পর্যন্ত ব্যবহার করত সে।

সাঈদের যন্ত্রণায় আমাদের এক বন্ধু তো আন্ডারওয়্যার পরাই ছেড়ে দিল। কারণ সুযোগ পেলেই সাঈদ তার আন্ডারওয়্যার পরত।

এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে সাঈদের সেই একই উত্তর, ঠেকার কাজ চালাইছি। তোর সাইজও মিডিয়াম আমারও মিডিয়াম। তুইও সুতি আন্ডারওয়্যার পরোস। আমিও সুতিরটা পরি। আমারটা খুঁইজা পাইতেছি না। তাই তোরটা পরছি। বিপদে বন্ধুর পরিচয়।

রাগে আর কষ্টে আমাদের সেই বন্ধু তার আন্ডারওয়্যার দুটি সাঈদকে দিয়ে দিল। আর নিজে বন্ধ করল আন্ডারওয়্যার পরা। এতদিন হয়ে গেল আমাদের সেই বন্ধু এখনও আন্ডারওয়্যার পরে না।

সাঈদের হল ছিল জসিমউদ্দীন। কিন্তু জসিমউদ্দীন হলে সিট পেল না সে। লেপ-তোশকের গাট্টি নিয়ে সাঈদ এসে উঠল আমাদের সূর্য সেন হলে।

ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্ররা খাটে জায়গা পায় না। তাদের ফ্লোরে থাকতে হয়। আমরাও তাই থাকি। সেখানে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো ফোঁড়ার ওপর ফুসকুরি হয়ে উদয় হলো সাঈদ।

আমরা বিরক্ত। তবে সেটা চেপে রেখে বললাম, ঘটনা কী?

সাঈদ বলল, ঘটনা কিছু না। ঠেকার কাজ চালাইতে আসছি। ঠেকা কাইটা গেলে নিজের হলে চলে যাব।

তা, এত হল থাকতে সূর্য সেন হল কেন?

সূর্য সেনের সঙ্গে জসিমউদ্দীনের চেহারার মিল আছে, সেইজন্য সূর্য সেন হল। ঠেকার কাজে মিলটা গুরুত্বপূর্ণ। চিনির কাজ গুড় দিয়া সামাল দেওয়ার মতো। মিল না থাকলে ঠেকার কাজ হয় না।

তোর মিল তো মিলে নাই। সূর্য সেন আর জসিমউদ্দীনের চেহারায় মিল পাইলি কোন জায়গায়?

আছে। আছে। ভালোভাবে খেয়াল করলে মিলটা ধরা যায়।

আচ্ছা, তোর কথা মানলাম। চেহারায় মিল আছে। কিন্তু মনের মিল তো আর ছিল না। একজন কবি আরেকজন বিপ্লবী।

এইটাই তো সবচেয়ে বড় মিল। কবি আর বিপ্লবী তো আসলে এক। কবি না হলে বিপ্লবী হওয়া যায় না। আবার বিপ্লবী না হলে কবি হওয়া যায় না। আর আমার ধারণা, তাদের দু'জনের সাক্ষাৎ হইলে মনের মিলটাও হইত।

এতই যখন মিল খুঁজিস তাহলে কবি সুফিয়া কামাল হলে গিয়ে উঠলেই তো পারিস। ওখানে গ্যাদারিং কম আছে। তা ছাড়া জসিমউদ্দীনের সঙ্গে সুফিয়া কামালের মিল বেশি। দু'জনেই কবি।

তোরা কি ভাবছিস, আমার বিবেচনায় সেইটা ছিল না? অবশ্যই ছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড় অমিলটা হইল ওইটা মেয়েদের হল।

নে সর, জায়গা দে।

আমাদের ঠেলে নিজের জায়গা নিজে করে নেয় সাঈদ। ঠেকার কাজ বলে কথা।

কিন্তু সাঈদের সেই ঠেকা আর কাটে না। কিংবা কাটলেও সে যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পুরো ছয় বছর সে আমাদের সঙ্গে সূর্য সেন হলে কাটিয়ে দেয়।

সাঈদের সঙ্গে এক রুমে থাকা কখনও কখনও বিরক্তিকর হলেও মোটের ওপর ব্যাপারটা ছিল বেশ উপভোগ্য।

সাঈদকে প্রায়ই দেখতাম বডি স্প্রের বদলে শরীরে এয়ারফ্রেশনার মাখছে।

জিজ্ঞেস করলে বলত, ঠেকার কাজ চালাইতেছি।

তাই বলে এয়ারফ্রেশনার?

হুম। জিনিস তো একই। দুইটাই তো সুগন্ধি।

জিনিস এক মানে! বডি স্প্রে আর এয়ারফ্রেশনার এক জিনিস হলো?

ধরতে গেলে একই। একটা বডির ভিত্রে দেয় আরেকটা ঘরের ভিত্রে দেয়। দুইটাই ভিত্রে কাজ করে।

তো একদিন টুথপেস্ট শেষ হয়ে যাওয়ায় সাঈদ বিকল্প কিছু খুঁজছিল। ঠেকার কাজ চালানোর জন্য। আমি সেভিং ক্রিম এগিয়ে দিলাম।

সেভিং ক্রিম কী জন্য!

ঠেকার কাজ চালা।

টুথপেস্টের ঠেকার কাজ সেভিং ক্রিম দিয়া!

সমস্যা কী? জিনিস তো একই। একটা গালের ভিত্রে মাখে আরেকটা গালের উপ্রে। মাঝখানে শুধু পাতলা একটা চামড়া।

সাঈদ আমার রসিকতায় যোগ দেয় না।

ফাইজলামি করিস না দোস। আজকে একটা সিরিয়াস ব্যাপার আছে।

সিরিয়াস ব্যাপার! কী?

আরে তোরে বলছি না। ওই যে। মুনমুনরে আজকে ...

সাঈদ বাকিটুকু বলতে পারে না। লজ্জায় তার সেভ না করা গালও লাল হয়ে যায়।

ওহ, আজকে ১৬ তারিখ।

আমি লজ্জার কারণ ধরতে পারি। মুনমুনকে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে মনের কথা বলবে সাঈদ। আমাকেও তার সঙ্গে থাকার জন্য অনুরোধ করেছে সে। যদিও আমার সেখানে কোনো কাজ নেই।

কাজ নেই মানে! দুইটা কাজ আছে তোর। যদি সাকসেসফুল হই তাইলে ফুল দিবি। আর না হইলে দিবি সান্ত্বনা।

সাঈদকে পরেরটাই দিতে হলো। মুনমুন মুখের ওপর না করে দেয় তাকে।

প্রেমে প্রত্যাখ্যাত বন্ধুকে কীভাবে সান্ত্বনা দিতে হয় সেই বয়সে অতটা জানা ছিল না।

সাঈদের পিঠে হাত রেখে বললাম, মুনমুন হয়নি তো কি হয়েছে। মুনকে ট্রাই কর। ও ফাঁকা আছে।

মুনকে ট্রাই করব মানে!

অবাক দৃষ্টিতে জানতে চায় সাঈদ।

ট্রাই করবি কারণ, দু'জনের মধ্যে ভালো মিল আছে। লম্বা-সুন্দর। নামও প্রায় কাছাকাছি। মুনমুন আর মুন। ঠেকার কাজ চলতে পারে।

আমার রসিকতায় সাঈদের কাটা ঘায়ে বিট লবণের ছিটা পড়ে।

সে ছ্যাত করে উঠে বলল, সব কাজ ঠেকায় চলে না। হ

সূত্রঃ সমকাল

 

 

ঢাকা / আমার ক্যাম্পাস/ এইচ আর