বৃহস্পতিবার, ২৪ মে ২০১৮, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

সাতদিন নয় ভিসামুক্ত বিশ্ব চাই

শরিফুল হাসান | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2016-09-23 00:00:00

৭ নাকি লাকি নাম্বার। অথচ আমরা সাত নিয়ে জটিল হিসেবের মধ্যে পড়েছি। বাংলাদেশের বাঙালি মাত্রই জানেন ভারতবর্ষের ভিসা পেতে কতোটা পথ পাড়ি দিতে হয়। সেই প্রক্রিয়া নিয়ে লিখতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে। কারণ একদশক আগে ছাত্র অবস্থায় যখন নিজের টাকায় ভারত ঘোরা শুরু করেছি তখন থেকেই ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতা নিয়ে ভরতের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে হাইকমিশনে ইমেইল করেছি। এরপর ডেপুটি হাইকমিশনারের আমাকে ডেকে পাঠানো থেকে শুরু করে নানা অম্ল মধুর ঘটনা আছে। সেসব গল্প আরেকদিন করবো। আজ বরং সাতের গল্প বলি।

২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আমাদের বহনকারী উড়োজাহাজ নামলো কলকাতায়। ২১-২২ আমাদের কনফারেন্স। আমাদের অনেকেরই ইচ্ছে এরপর আরও দুই তিনদিন ঘুরবো। কিন্তু ২৪,২৫,২৬ সেপ্টেম্বরের ফেরার টিকিট পেতে ঝামেলায় আমাদের সবার ফেরার টিকিট করা হয়েছে ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে। ভাবলাম কলকাতায় এসে জেট এয়ারের অফিসে গিয়ে টিকিট বদলঅবো। সেই উদ্দেশ্যে হোটেল থেকে নেমে পার্ক স্ট্রীটে গিয়ে অফিস বন্ধ পেয়েছি সেটা আগেই বলেছি।

কলকাতার এক বড় ভাই বন্ধু যিনি এখানকার যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা বললেন পার্ক স্ট্রীটের বদলে এয়ারপোর্টে গিয়ে চেষ্টা করো। সময় বাঁচবে। অগত্যা গতকাল কনফারেন্সের এক ফাঁকে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্য রওয়ানা হলাম আল্লাহর নাম নিয়ে।  সঙ্গী অফিসেরই আরেক রিপোর্টার আশরাফ যে প্রথমবার ভারতে এসেছে। ওর ধারণা আমি যেহেতু অনেকবার এসেছি আমি ওর চেয়ে ভালে রাস্তাঘাট চিনবো। ওর ভুল আর আমি ভাঙাই না। ওকে নিয়ে আমি যখন জেট এয়ারের কাউন্টারে তখন বেলা ১২ টা।

 আমাদের দুজনের সাথে আরও দুজনের পাসপোর্ট। স্পোর্টস এর পবিত্র কুন্ডু দা আর অবুঝ বালিকাদের ফেসবুক হিরো রাজিব হাসান। চার পাসপোর্ট নিয়ে আমি জেট এয়ারের সুন্দরী কর্মকর্তার সাথে কথা বলার জন্য লাইন দিলাম। কিন্তু তার সামনে ছেলেদের লম্বা লাইন দেখে নিরুপায় হয়ে অন্য কাউন্টারে থাকা ছেলে নির্বাহীর সামনে গিয়ে পরিস্কার বাংলায় বললাম টিকেটের তারিখ বদলাতে চাই। তিনি জানালেন ২৪ তারিখের কোন টিকিট নেই। তো ২৫ দাও। নেই স্যার। আচ্ছা ২৬। কিছুক্ষণ কম্পিউটার টেপাটেপি করে বিমর্ষ মুখে জানালো স্যার ২৬ তারিখেরটাও নেই। তবে কয়েক সেকেন্ড পরেই হাসিমুখে বললো স্যার ২৭ এর আছে।

আমাদের স্পোর্টসের ডেপুটি এডিটর পবিত্র দা নাকি ২৭ তারিখে যাবেন। আমি বললাম আচ্ছা তুমি যে ২৭ দিতে  চাচ্ছো একটা কথা বলো কনফারেন্স ভিসায় সর্বোচ্চ সাতদিন থাকা যায়। আমরা এসেছি ২০ তারিখ সন্ধ্যায়। ২৭ তারিখ সকাল ৯ টায় ফিরলে সেটা কী সপ্তমদিন নাকি আমাদের অষ্টম দিন হবে? ঘন্টার হিসেব করলো তো সাতদিন হবে সন্ধ্যায়। কারণ আমরা ২০ তারিখ সন্ধ্যায় এসেছি। কিন্ত আমার ধারনা ২০ তারিখ থেকেই হিসাব হবে। তাহলে সপ্তমদিন হবে ২৬। কাজেই আমাদের ২৬ তারিখ রাত ১২ টার আগে ফিরতে হবে। আপনি ২৭ তারিখের টিকেট দিলে সমস্যা হবে না তো? ছেলেটি বললো বিষয়টা জটিল। আমি খোঁজ নিয়ে বলি। কম্পিউটার ঘাটাঘাটি করে এর ওর সাথে কথা বলে ছেলেটি জানালো স্যার এ বিষয়ে এয়ারপোর্ট ম্যানেজার বলতে পারবেন। তার রুমে যান।

 এরপর খুঁজে খুঁজে গেলাম এয়ারপোর্ট ম্যানেজারের রুমে। তার সহকারীকে পেলাম। সমস্যা শুনে তিনি বললেন স্যার রাউণ্ড থেকে আসুক। আপনারা বসুন। কিছুক্ষণ পর তিনি এলেন। ম্যানেজার সাহেব প্রথম আলোর আর বাংলাদেশ শুনে একটু খাতির করলেন। সাতদিনের বিষয়ের কোন সমাধান না দিয়ে বললেন বিষয়টা ইমিগ্রেশনের। তারাই বলতে পারবে। এরপর তিনি নিজেই তার টেলিফোন থেকে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাকে ফোন দিয়ে আমায় ধরিয়ে দিলেন।

আমি এবার ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাকে পুরো ঘটনা বললাম। তাকে জানালাম আমরা ২৪ থেকে ২৬ কোনদিনেরই টিকিট পাচ্ছি না। যেহেতু টিকিট নাই ২৭ তারিখ কোন সমস্যা হবে কী না? সব শুনে তিনি বললেন আমার বড় স্যার মিটিংয়ে। তিনি আসুক। তবে স্যার একটা মিটিংয়ে গেছেন। ঘন্টা তিনেক বসতে হবে। আমি বললাম সেটা তো সম্ভব না। কারন আমি কনফারেন্সের মাঝখান থেকে এসেছি। এখুনি ফিরতে হবে। তুমি আমাকে শুধু এটা বলো আমি যদি ধরে নেই ২৭ তারিখ একদিন বেশি এবং ভিসার মেয়াদের একদিন পরে আমি ফিরছি। তাহলে আইন অনুযায়ী তুমি কী আমাকে জেলে পাঠাবে? তিনি বললেন না। তোমাকে শুধু জরিমানা করা হবে। আমি বললাম জরিমানা কতো? সেটা দেবে। তিনি বললেন জরিমানা কতো এই মুহুর্তে তার জানা নেই। স্যার এলে বলতে পারবেন। আমি বললাম খুব বেশি কী হবে? আমি জরিমানাই দেবো। আর কোন কাজ নাই তো? তিনি বললেন জরিমানার আগে আমাকে ফরেনার রেজিস্ট্রোশন অফিস থেকে অনুমতি আনতে হবে। তারা চাইলে জরিমানা মাফ করে দিতে পারে? আমি বললাম ওদের অফিসটা  কোথায়? তিনি যে ঠিকানা দিলেন সেটা এয়ারপোর্ট থেকে তিন ঘন্টার পথ। এবার আমি বিরক্ত হয়ে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম।

ইতিমধ্যে আমার ভারত সরকারের সেই বড় কর্মকর্তা বড় ভাই ফোনে জানতে চাইলেন টিকেট পেছাতে পেরেছি কি না। তিনি তাহলে ২৪-২৫ সরকারি ছুটির দুদিন আমায় নিয়ে বেড়াবেন। টিকিট বদলাতে পারিনি শুনে তিনি বললেন ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে নাও। আমি রাইটার্স বিল্ডিংয়ে যে ভিসার মেয়াদ বাড়ায় তার নাম্বার দিচ্ছি। তার সাথে কথা বলো। আচ্ছা দাড়াও আমিই কথা বলে জানাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর তিনি বিরসমুখে জানালেন টুরিষ্ট ভিসা হলে মেয়াদ বাড়ানো যেতো কিন্তু কনফারেন্স ভিসার মেয়াদ বাড়ানো যায় না। এটা সাতদিনই।

সব শুনে আমাদের ফিচার এডিটর সুমনা শারমীন আপা বললেন তোরা তো মমতা আর মোদিজি ছাড়া আর কাউকে বাকি রাখিস নাই। তাও কাজ হলো না? মনের দুঃখে পূর্বপুরুষ বাংলাদেশ থেকে আসা ওই বড় ভাই বললেন আচ্ছা শরিফ বলো তো তোমার আমার দেশ থেকে এই ভিসার ঝামেলা কবে শেষ হবে? কবে আমরা শুধুমাত্র অ্যারাইভালের ভিসা নিয়েই ঘুরতো পারবো দুই দেশে? যতো খুশি ততোদিন। সেই প্রশ্ন আমিও রেখে গেলাম দুই দেশের সরকারের কাছে। আপনারাই বলেন ভারত বাংলাদেশের মানুষ কবে থেকে ভিসা ছাড়া দুই দেশে অবাধে চলাচল করতে পারবে? কেন জানি বহুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে দেখা সেই স্লোগানটার কথা মনে পড়ছে। ভিসামুক্ত বিশ্ব চাই।

 [লেখাটি সংগ্রহ করা হয়েছে লেখক শরিফুল হাসানের ব্লগ থেকে।]