বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ৯ ফাল্গুন ১৪২৪
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

গোয়েন্দা রিপোর্ট ও লিখিত পরীক্ষা নিয়ে আপত্তি

ডেস্ক রিপোর্ট | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2016-10-18 00:00:00

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার পক্ষে নন উপাচার্যরা। তারা মনে করেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রথম শ্রেণিপ্রাপ্তরাই কেবল শিক্ষক পদে আবেদন করেন। তাই তাদের লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার কোনো আবশ্যকতা নেই। প্রার্থীদের পরিচিতি যাচাইও অনাবশ্যক বলে মনে করেন উপাচার্যদের কেউ কেউ।

তারা বলেন, এর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে পারেন কোনো কোনো মেধাবী প্রার্থী। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী  বলেন, লিখিত পরীক্ষা নেওয়া ও পুলিশের মাধ্যমে পরিচিতি যাচাইয়ের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসৃত হলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে গত ২৪ সেপ্টেম্বর নতুন দুই নির্দেশনা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।

উপাচার্যদের কাছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দেশনা পাঠানো হয়। তাতে বলা হয়, 'ইদানীং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। তাই এ সমস্যা সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গোয়েন্দা বিভাগের গোপনীয় প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত দুটি সুপারিশকে আমলে নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।' এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, 'পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো পুলিশ ভেরিফিকেশন অথবা গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা কোনো তথ্য যাচাই করা হয় না। তাই এখন থেকে শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের পূর্বে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করে নিয়োগ করা যাবে।' অন্য নির্দেশনায় বলা হয়েছে, 'পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়, ফলে এতে অনিয়মের অনেক সুযোগ তৈরি হয়। তাই মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রার্থীর মেধা যাচাই করা সহজ হবে এবং অনিয়মের সুযোগ কমে যাবে।' এ নির্দেশনাটি চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল স্বাক্ষরিত হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথম প্রকাশ করা হয়। এসব বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য ইউজিসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ইউজিসি চিঠিতে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে বিষয়টি জানিয়ে দেয়।

জানা গেছে, বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই সপ্তাহে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনার ব্যাপারে উপাচার্যদের প্রবল আপত্তি রয়েছে। তবে কেউ কেউ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খুলতে রাজি নন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অস্ট্রেলিয়া সফররত ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান  বলেন, আইন অনুসারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বাধীন। তারা নিজেদের আইনে চলে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কাউন্সিল, সিনেট ও সিন্ডিকেটে আলোচনা করে তাদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেবে।

সরকারের এ নির্দেশনার বিরোধিতা করে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী  বলেন, লিখিত পরীক্ষা দিয়েই তো একজন শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রথম শ্রেণি পান। নিয়োগের ক্ষেত্রে তাকে আবার লিখিত পরীক্ষা দিতে হবে, এটি অকল্পনীয়। পরীক্ষা মানেই জটিলতা। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে এতে। তিনি বলেন, পুলিশ ভেরিফিকেশন মানেই যাদের সঙ্গে পুলিশের 'খাতির' নেই সেই নিরীহ ছাত্ররা বিপদে পড়ে। এই দুই নিয়ম চালু করা হলে শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীরা নিরুৎসাহিত হবেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক  বলেন, পত্র-পত্রিকার মাধ্যমেই তারা মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরেছেন। এখনও এ-সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা বা চিঠিপত্র তাদের হাতে পৌঁছেনি। আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্র পাওয়ার পরই তারা এই নতুন সিদ্ধান্তের ভালো-মন্দ দিক নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে মতামত দিতে পারবেন। নির্দেশনা পাওয়ার আগ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত নিয়ম অনুসারেই শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, প্রত্যেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বিধি রয়েছে। এই বিধি অনুসরণ করেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হলে কাগজে-কলমে পরীক্ষা না নিলেও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। মৌখিক পরীক্ষায় অনেক প্রশ্ন করা হয়। এমনকি তাৎক্ষণিক কোনো বিষয়ের ওপর লিখিত এবং উপস্থাপনাও নেওয়া হয়ে থাকে। তবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আগে বেশ কয়েকবার লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এখন লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয় না। মূলত একজন ভালো ছাত্রকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক বিভাগের সিলেকশন বোর্ড যাচাই-বাছাই করে যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীকেই নিয়োগের জন্য সিন্ডিকেটে সুপারিশ করে থাকে। পুলিশ দিয়ে পরিচিতি যাচাই প্রসঙ্গে অধ্যাপক মীজানুর রহমান বলেন, সরকারি চাকরিতে এখনও পুলিশ ভেরিফিকেশনের নিয়ম চালু রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও এমনটা করা যেতে পারে। তবে কেউ যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার না হন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন  বলেন, 'এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত পরিপত্র এখনও পাইনি। তাই এ বিষয়ে কথা বলার মতো সময় এখনও আসেনি।' তবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহ আজম শান্তনু বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যেহেতু কথা বলতে পারা, প্রেজেন্টেশন, গবেষণা কার্যক্রম, ভালো ফলসহ বিভিন্ন দক্ষতার বিষয় থাকে, তাই সেখানে লিখিত পরীক্ষা ততটা কার্যকর নয়। নতুন যেসব বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে সেগুলোর ব্যাপারে এই সিদ্ধান্ত অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত হতে পারে।'

অবশ্য খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. ফায়েক উজ্জামান প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা গ্রহণে সরকারের নির্দেশনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি  বলেন, প্রভাষক নিয়োগের সময় লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ করা হলে প্রার্থীদের মেধা যাচাই করার সুযোগ পাওয়া যাবে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সিন্ডিকেট সভায় বিষয়টি অনুমোদন করিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভবিষ্যতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হবে। যদি মাত্র দুটি পদের বিপরীতে ৫-৬ জন প্রার্থী থাকে সে ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হবে না। (সমকালের সৌজণ্যে)

 

 

ঢাকা/ এ এম