শুক্রবার, ২২ জুন ২০১৮, ৮ আষাঢ় ১৪২৫
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

দেশ পেরিয়ে অলিম্পিকে

Published: 2016-11-23 00:00:00

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ছাত্রী শিরিন আক্তার। আমাদের দ্রুততম মানবী। গিয়েছেন ব্রাজিল অলিম্পিকেও। তাঁর গল্প শোনাচ্ছেন হোসাইন মিঠু। ছবি তুলেছেন রাব্বিউল রাতুল

ছোটবেলা থেকেই তিনি চঞ্চল। সারাক্ষণ দৌড়ে বেড়ান। তবে অন্য শিশুর সঙ্গে তাঁর পার্থক্য কখনোই পড়ে গিয়ে বসে থাকেননি তিনি। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়েছেন, যত ব্যথাই পান না, আবার দৌড় শুরু করেছেন। এই লড়াইয়ের মানসিকতা, দৌড়ের প্রতি সহজাত তাড়নাই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। সাতক্ষীরার দহকুল নামের একটি গণ্ডগ্রাম থেকে উঠে এসে তিনি এ দেশের দ্রুততম মানবী হয়েছেন। অলিম্পিকেও দেশের পতাকা নিয়ে অংশ নিয়েছেন।

তাঁর পুরো নাম শিরিন আকতার। লেখাপড়ার শুরু সাতক্ষীরা সদরের এক স্কুলে। প্রাইমারি পড়েছেন দহকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্কুলজীবনের শুরু থেকেই নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। বরাবরই বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার, ২০০ মিটার ও লংজাম্পে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। অন্য খেলার দিকে ঝুঁকে না পড়ে দৌড়ের দিকে কেন এলেন—এ প্রশ্নের জবাবে শিরিন বললেন, ‘আসলে অন্যগুলো দলগত খেলা। খেলতে গেলে সঙ্গী লাগে। সাতজন, ১০ জন মেয়ে কোথায় পাব? আমাদের ছোটবেলায় মেয়েদের খেলাধুলাকে তো পরিবার বা সমাজ থেকে উৎসাহিত করা হয়নি। ফলে একা একা খেলা যাবে—এমন খেলাগুলোই প্র্যাকটিস করেছি। দৌড়টা কেন যেন রক্তে মিশে আছে।’

প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পরই তাঁর প্রতিভার কথা চারদিকে ছড়িয়ে গেল। তিনি ২০০৫ সালে কারিমা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। সে বছরই উপজেলা ও জেলাপর্যায়ের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হলেন। এমনকি জেলা দলের হ্যান্ডবল টিমের সদস্য বাছাইয়ের সময় তাঁকে দেখেই কোচ বলেছিলেন, ‘তোমার দাঁড়ানোর স্টাইল খেলোয়াড়দের মতো। তোমাকে বাছাইয়ে অংশ নিতে হবে না, নির্বাচিত হয়ে গেছ।’ খেলার প্রতি তাঁর আগ্রহ ও সাফল্য দেখে বিকেএসপিতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য নির্বাচিত করা হয়। সাত দিনের জন্য ঢাকায় এলেন শিরিন এবং সেখানে শারীরিক ও লিখিত পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরলেন। পরে তাঁদের বাসায় একটি চিঠি এলো, ‘শিরিন আক্তার অ্যাথলেটিকসে সুযোগ পেয়েছে।’ তবে বাবা কোনোভাবেই মেয়েকে ঢাকায় পাঠাবেন না। মা-ও রাজি নন। মামা তাঁদের বোঝালেন। তিনি বাসের টিকিটও কিনে নিয়ে এলেন। তারপর বাবা মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় এলেন। বিকেএসপি ঘুরে দেখে, থাকার ভালো ব্যবস্থা দেখে, কোচদের সঙ্গে কথা বলে তাঁর ভালো লাগল। ২০০৭ সালে মেয়েকে ভর্তি করে চোখের জল মুছতে মুছতে বাড়ি ফিরে গেলেন বাবা শেখ আবদুল মজিদ।

নতুন পরিবেশ, আধুনিক উপকরণ, কঠিন নিয়মকানুনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাঁর দুটি বছর লেগেছিল। তবে তখনো শিরিন তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে ১০০ মিটার দৌড়ে রানার-আপ ছিলেন। এরপর ২০১৪ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর ১০০ ও ২০০ মিটারে দেশের সেরার খেতাব নিজের ঝুলিতে পুরে রেখেছেন। এমনকি এ বছর আমাদের ক্রীড়াবিদদের মধ্যে সেরা টাইমিং করে দেশের সেরা নারী দৌড়বিদ হয়েছেন।

এ প্রতিযোগিতাটি হয়েছিল ফেব্রুয়ারিতে। তার আগে বিভাগে পরীক্ষা ছিল, শরীরটাও ভালো ছিল না বলে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারেননি শিরিন।

তার ওপর ভারত ও শ্রীলঙ্কার মতো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী আছে। তার পরও ট্র্যাকে দাঁড়ানোর পরই তাঁর মনে শক্তি এসে গেল, ভালো করতেই হবে, আমি ফাইনালে যাবই। ফলে জীবনের সেরা টাইমিংটি করে ফেললেন শিরিন আক্তার। ১১.৯৯ সেকেন্ড আমাদের দেশেরও সেরা। ফলে ব্রাজিলে যাওয়ার জন্য দলে সুযোগ হয়ে গেল।

তিনি থেকেছেন রিওর অলিম্পিক গেমস ভিলেজে। বিশাল এই ভিলেজে এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত যেতে বা কোনো কাজে ভিলেজ থেকে বেরোনোর জন্য মেট্রোরেলে চড়তে হয়। প্রায়ই বাইরে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। সেখানে বিশ্বখ্যাত খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছে। সে গল্পই বললেন, ‘একদিন ডাইনিংয়ে খেতে বসে দেখি, একটু দূরে উসাইন বোল্ট খাচ্ছেন। আমার চোখে চোখ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হেসে দিলেন। সেদিন আমার পাশের চেয়ারে বসেই শেলি-অ্যান-ফ্রেজার-প্রাইস খেয়েছেন।’ খ্যাতনামা এই খেলোয়াড়দের সবার মধ্যেই পরস্পরকে কাছে টেনে নেওয়ার প্রবণতাটি দেখেছেন তিনি। দেখা হলেই হেসে কথা বলেছেন, যেন কত দিনের পরিচিত তাঁরা। তাঁদের মধ্যে শেলি-অ্যান-ফ্রেজার-প্রাইসের কথা আলাদা করেই বললেন শিরিন।

শিরিন-শেলির ২০১৩ সালে ফেসবুকে পরিচয়। পরের বছর কমনওয়েলথ গেমসে সামনাসামনি দেখা। তার পর থেকে তাঁরা ভালো বন্ধু। জ্যামাইকার এই মেয়েটি ২০০৮ ও ২০১২ সালের অলিম্পিকে ১০০ মিটারে স্বর্ণপদক জিতেছেন। তিনি ইতিহাসের তৃতীয় নারী, যিনি অলিম্পিকে ১০০ মিটারে পর পর স্বর্ণপদক জয় করেছেন। উদার ও হাসি-খুশি এই বিশ্বখ্যাত স্প্রিন্টারের সঙ্গে অনেক আলাপ হয়েছে শিরিনের। আমাদের দেশের খেলোয়াড়রা কেন ভালো করতে পারেন না, আর কেন তাঁরা এত ভালো করছেন—এ প্রশ্নের জবাবে শেলি বলেছেন, ‘খেলার সঙ্গে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও ভালো পরিবেশের খুব সম্পর্ক আছে। ক্যালরি খরচ করে পরিশ্রম করতে হবে। আবার সেটি পূরণেরও ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে দৈহিকভাবে ফিট হওয়া যাবে না। ভালো খেলোয়াড় হওয়ার জন্য ভালো পরিবেশও খুব দরকার।’ শেলি আরো বললেন, ‘তোমরা যেখানে অল্প সময় খেলেই ভালো ফলের আশা করে বসে থাকো, সেখানে আমরা দিনের পর দিন খেলে যাই। গেল পাঁচ-সাত বছর ধরে আমি বিদেশে ভালো কোচের কাছে প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। তাতে নিজেকে আরো দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলতে পারব। ভালো করার জন্য প্র্যাকটিসের কোনো বিকল্প নেই।’ 

অলিম্পিকের ১০০ মিটারের মূল ইভেন্টে অংশ নিতে না পারলেও তিনি ট্রায়ালে ছিলেন। সেখানে পঞ্চম হয়েছেন আমাদের মেয়ে।

ফিরে আসার পর তাঁর জীবনটি বদলে গেছে। এখন বাবাও চান মেয়ে খেলোয়াড় হিসেবে আরো ভালো করুক। শিরিন আক্তার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন। ক্যাম্পাসে যাওয়ার পর ছোট, বড় এমনকি সহপাঠীরা পর্যন্ত সেলফি তোলার জন্য ঘিরে ধরে। তাঁর ফেসবুকের টাইমলাইন অভিনন্দনের পোস্টে ভেসে গেছে। তবে বিখ্যাত এই মেয়ের রুটিন একটুও বদলায়নি। প্রতিদিন ভোরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়ামে প্র্যাকটিস করেন। তাঁর স্বপ্ন এসএ গেমসে স্বর্ণ জিতবেন। অংশ নেবেন টোকিও অলিম্পিকে।

 

 

 

ঢাকা/ এইচ আর