বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ৯ ফাল্গুন ১৪২৪
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

দিয়াজের মৃত্যু: আদালতে হত্যা মামলা, আসামি চবির সহকারী প্রক্টর-ছাত্রলীগ সভাপতি

ডেস্ক রিপোর্ট | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2016-11-25 00:00:00

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তাকে হত্যার অভিযোগে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন তার মা জাহেদা আমিন চৌধুরী। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শিবলু কুমার দের আদালতে এ মামলা করা হয়। আদালত মামলাটি তদন্ত করে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলায় আসামি করা হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আনোয়ার হোসেন, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা জামশেদুল আলম চৌধুরী, চবি ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি আলমগীর টিপু, কর্মী রাশেদুল আলম জিশান, আবু তোরোব পরশ, মনসুর আলম, আবদুল মালেক, মিজানুর রহমান, আরিফুল হক অপু ও মোহাম্মদ আরমানকে।

দিয়াজের বোন জুবেয়দা সারোয়ার চৌধুরী জানান, তারা মামলার আর্জিতে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১, ও ২৩৪ ধারায় অভিযোগ এনেছেন। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে তদন্ত শেষে ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

মামলার এজাহারে দিয়াজের কাছে চাঁদা দাবি, বাসায় হামলা ও হত্যার হুমকির দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করে বলা হয়, এরই ধারাবাহিকতায় দিয়াজকে হত্যা করা হয়েছে। আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে দিয়াজের মায়ের কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। চাঁদা না দিলে দিয়াজকে হত্যার হুমকিও দেয় আসামিরা।
চাঁদা না দেওয়ায় গত ৩১ অক্টোবর রাতে বাসায় প্রবেশ করে ভাংচুর ও লুটপাট করে। এ ঘটনা নিয়ে হাটহাজারী থানায় মামলা করতে গেলে বর্তমান ছাত্রলীগ নেতা আলমগীর টিপুর নাম বাদ দিয়ে গত ২ নভেম্বর মামলা নেয় পুলিশ। ওই মামলা করার পর আসামিরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে দিয়াজের মাকে মামলা তুলে নিতে হুমকি দেয়। মামলা তুলে না নিলে দিয়াজকে খুন করে লাশ গুম করে ফেলারও হুমকি দেয় আসামিরা।

আর্জিতে বলা হয়- হত্যাকারীরা আলামত গোপনের জন্য দিয়াজকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে বিছানার চাদর দিয়ে ঝুলিয়ে রেখে বেলকনি দিয়ে পালিয়ে যায়। দিয়াজের কক্ষের উত্তর পাশে বেলকনির দরজা খোলা ছিল। আসামিরা বেলকনি দিয়ে দুই তলা থেকে নামার জন্য পাশের নির্মাণাধীন ভবনের কাজে ব্যবহৃত মই ব্যবহার করে। আসামিরা সুকৌশলে দিয়াজের কক্ষে ঢুকে তাকে শোবার ঘরের খাটের উপর ফেলে দুই হাত ঝাপটে ধরে। গলার বাম পাশে কিছু দিয়ে সজোরে পেঁচানো হয়। বাধা দেয়ার চেষ্টা করায় দিয়াজের হাতে ও পায়ে আঘাত পায় এবং এতে আঘাতের চিহ্ন সৃষ্টি হয়। হত্যার রহস্য ও আলামত লুকাতে বিছানার চাদর গলার ডান পাশে পেঁচিয়ে বামপাশে ঢিলা গিট দিয়ে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলানো হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। আর্জিতে আরও বলা হয়, গ্র্যাভিটি নিয়মানুসারে গলার ডানপাশে গুরুতর জখম হওয়ার কথা। কিন’ জখম গলার বামপাশে। এতে অনুমেয়, লাশ হত্যার পর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। দিয়াজের উচ্চতা পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি অথচ ঘরের ফ্যান থেকে বিছানার উপরের অংশের উচ্চতা (যেখানে লাশ ঝুলন্ত অবস’ায় ছিল) পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি। দিয়াজের পা বিছানার ওপর ছিল। হাত ছিল মুষ্টিবদ্ধ।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনা বলেন, ‘দিয়াজ আত্মহত্যা করেছে বলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে এসেছে। এতে চমেকের তিন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ স্বাক্ষর করেছেন। দিয়াজকে হত্যা করেনি কেউ। তিনি আত্মহত্যা করেছেন।’
এর আগে গত বুধবার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পুলিশের কাছে জমা দেয়ার পর হাটহাজারী থানায় মামলা করতে গেলে দিয়াজের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা নেয়নি পুলিশ।
এ প্রসঙ্গে হাটহাজারী থানার ওসি বেলাল উদ্দিন মো. জাহাঙ্গীর  বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধি অনুয়ায়ী ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যা এলে মামলা নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে পরিবার চাইলে মামলা দিতে পারে। তবে এক্ষেত্রেও তথ্য প্রমাণ থাকতে হবে। বিষয়টি আগে পুলিশ তদন্ত করে দেখবে। এরপর আইনগত পদক্ষেপ নেবে।’
২০ নভেম্বর রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দুই নম্বর গেট এলাকার নিজ বাসা থেকে দিয়াজের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গত সোমবার তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এরপর গত বুধবার দিয়াজের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পুলিশের কাছে জমা দেয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তিন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ। এর তিন সপ্তাহ আগে দিয়াজসহ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের চার নেতার বাসায় ভাংচুর চালানো হয়। দিয়াজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক ছিলেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দুটি ভবন নির্মাণের ৯৫ কোটি টাকার টেন্ডার বাগবাটোয়ারা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি আলমগীর টিপুর অনুসারী নেতা-কর্মীরা ওই হামলা চালান বলে অভিযোগ করেছে দিয়াজের পরিবার। ওই দুটি প্রকল্পের টেন্ডার কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে গত কয়েকমাস ধরে একাধিকবার হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন নেতাকর্মী।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) রেজাউল মাসুদ বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধুরী আত্মহত্যা করেছেন বলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সুরতহাল প্রতিবেদনে দিয়াজের শরীরে যে চিহ্নগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা আত্মহত্যাজনিত কারণে। তবে ঘটনার পর দিয়াজের অনুসারী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দাবি করেন, দিয়াজকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এমন অভিযোগ দিয়াজ ‘হত্যায় জড়িতদের’ গ্রেফতারের দাবিতে তার অনুসারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা হাটহাজারী সড়ক অবরোধ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়গামী শাটল ট্রেন আটকে বিক্ষোভ করেছে।

 

 

ঢাকা/ এইচ আর