সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ৬ ফাল্গুন ১৪২৪
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক

আয়েশা পারভীন চৌধুরী | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2016-12-09 00:16:27

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক নিয়ে অনেক ধরনের আলাপ-আলোচনা চলে। এই ধরনের আলোচনার মূল বক্তব্য হচ্ছে-একটি সুন্দর শিক্ষাদান পদ্ধতি, যার মাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ে লাভবান হয়। আমাদের দেশে শিক্ষাদান পদ্ধতি নিয়ে অনেক গবেষণা হলেও সুনির্দিষ্ট কোন পদ্ধতি গ্রহণ করা সম্ভব নয়। কারণ একজন শিক্ষক তার নিজের নিয়মে ও ভঙ্গিতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে থাকেন। আর শ্রেণীকক্ষে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসায় তাদের আচার-আচরণ বেশ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

আমি একজন শিক্ষক। তাই আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যতটুকু সম্ভব ততটুকু বন্ধুত্বমূলক সম্পর্কের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করি। কোন ধরনের ভয়ভীতি বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে পাঠদান করা থেকে বিরত থাকি। শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষাকে সহজ ও আনন্দদায়ক করে উপস্থাপনের জন্য তাদের অর্জিত জ্ঞানকে উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করি।
ভীতির মাধ্যমে নয়, বরং অংশগ্রহণমূলক ও প্রশংসামূলক শিক্ষাদান পদ্ধতির মাধ্যমে শ্রেণীকক্ষের শিক্ষাকার্যক্রম প্রাণবন্ত হয়ে উঠে। একজন শিক্ষক তার নিজস্ব ভঙ্গি ও প্রকাশক্ষমতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম হন। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা যদি মনোযোগী না থাকে তাহলে শিক্ষকের শতভাগ আন্তরিকতা থাকলেও কোন ফলপ্রসূ শিক্ষাকার্য হয় না।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধ করতে সরকার ২০১০ সালের ৯ আগস্ট একটি পরিপত্র জারি করে। এই পরিপত্রের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয়, দেশের সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ওপর সব ধরনের শারীরিক শাস্তি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
কিন্তু সরকারের এই নিষেধাজ্ঞা অনেকে যে তোয়াক্কা করছেন না, তার প্রমাণ পাওয়া গেল রাজধানীর উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের হাতে অষ্টম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর নির্দয়ভাবে মার খাওয়ার ঘটনায়।
১৩ এপ্রিল একজন শিক্ষক ওই শিক্ষার্থীকে ক্লাস থেকে ডেকে নিয়ে তার কানে ও মাথায় মারেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে শিক্ষার্থীর কান থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৫০ জন অভিভাবক ওই শিক্ষকের বিচার চাইতে বিদ্যালয়ে এসেছিলেন। কিন্তু বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের ফটকের ভিতরে ঢুকতেই দেয়নি। পরিতাপের বিষয়, উক্ত নির্যাতনকারী শিক্ষকের প্রতি স্কুল কর্তৃপক্ষের প্রশ্রয়ের বেশ প্রমাণ মিলেছে। একজন শিক্ষকের এহেন আচরণের ফলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে শিক্ষক ও অভিভাবকবৃন্দের মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এর ফলে শ্রেণী-কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রশাসনিক দিক নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্যে স্কুলের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়।
আরেক শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ফেনী সদরের একটি মাদ্রাসায়। ওই মাদ্রাসার একজন শিক্ষক এক শিক্ষার্থীকে বেত দিয়ে মেরেছেন, ঘরের সিলিং ফ্যানের হুকে ঝুলিয়ে ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে ইচ্ছেমত পিটিয়েছেন। ওই শিক্ষার্থী মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য বাড়ি যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু অনুমতি না মেলায় সে পালানোর চেষ্টা করে। ফলে তার ওপর চলে এই ধরনের নির্মম শাস্তি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে আমরা অনেক তথ্য জানতে পারি। একটি ছবিতে দেখা যায়, বেশ কিছু কোমলমতি শিক্ষার্থী তাদের হাত দুইটি সামনে মাটিতে প্রসারিত করে মাথা নিচু করে শুয়ে আছে। আর একজন ব্যক্তি মোটর সাইকেলে চড়ে তাদের হাতের আঙ্গুলের উপর দিয়ে এগুচ্ছে। খুব অবাক লাগল। মনোযোগ দিয়ে ছবির সাথে তথ্যের মিল খুঁজতে গিয়ে হতবাক হয়ে যাই। স্কুলের কোন একটা অনিয়মের জন্য শিক্ষার্থীদের এই ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। উক্ত মোটর সাইকেল আরোহী আর কেহ নন, সেই সব কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষক। শাস্তির এই নমুনা দেখে এই শিক্ষককে শিক্ষক বলতে দ্বিধাবোধ করছি।
অথচ দেশের ভবিষ্যতের সকল ধাপে ধাপে শিক্ষকদের আন্তরিকতা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও নিবেদিত ভূমিকা একান্ত বাঞ্ছনীয়। কিন্তু কতিপয় শিক্ষকের এমন অমানবিক ও নিয়ম বহির্ভূত আচরণের ফলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষক সমাজকে নানাভাবে ও নানা সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়।
শুধুমাত্র শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থী পেটানোর সংবাদই শেষ নয়। আজকাল আমাদের সমাজে শিক্ষককেও পেটানো হয়। ঝিনাইদহ পৌর এলাকার এক ছাত্রের বাবা তাঁর শিক্ষককে মারধর করায় ওই ছাত্রকে বার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ আছে। শিক্ষার্থীর বাবা জানান, কিছুটা অসুস্থ হওয়ার পর উক্ত শিক্ষার্থী ক্লাসে অংক করতে পারেনি, এতে ওই শিক্ষক তাকে মারধর করেন। এই শিক্ষার্থীর বাবা অন্যান্য শিক্ষকদের সাথে এই বিষয়ে তর্কে জড়িয়ে যান। এক পর্যায়ে ওই শিক্ষার্থীর আত্মীয় সেই শিক্ষকের গায়ে হাত তোলেন। অভিভাবক ও শিক্ষকের ভুল বুঝাবুঝির ফলে সেই কোমলমতি শিক্ষার্থী আর পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে নাই। প্রতিষ্ঠান প্রধানের মতামত অনুযায়ী জানা যায়, ছেলের বাবা প্রথমেই নিজে পরীক্ষা দেওয়াতে চান। পরে বাচ্চাকে নিয়ে এলেও সমস্যার কারণে পরীক্ষা দেওয়া হয় নাই। এই ধরনের পরিস্থিতির জন্য উক্ত শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যে যে ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে তার খেসারত দিতে হয় একজন কোমলমতি শিক্ষার্থীকে।
শিক্ষক কিংবা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা অভিভাবক সকলে যদি সংযত আচরণ ও পরিমিতিবোধের আশ্রয় নেন, তা হলে এ ধরনের সমস্যার উদ্ভব হয় না। আমাদের সমাজকে অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা পেয়ে বসেছে। শিক্ষার্থীদের শাস্তি প্রদান সম্পর্কিত সরকারি বিধিনিষেধ যথাযথ পালনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মটিভেশনও প্রয়োজন। পরিবার, সমাজ পরিশুদ্ধতার পথে এগোলে তার প্রভাব কিশোর-তরুণ শিক্ষার্থীদের ওপরও পড়বে।
সম্প্রতি শিক্ষক পিটানোর ঘটনাকে নিন্দা জানিয়ে পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশন সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে। শিক্ষকদের ওপর হামলাকারীরা প্রভাবশালী মহলের মদদ পায়। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এ ব্যাপারে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেয়া। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কঠোর মনোভাব প্রয়োজন।
দুষ্কৃতিকারী কর্তৃক শিক্ষক পিটানোর ঘটনায় জাতি আজ লজ্জিত ও আতঙ্কিত। এমতাবস্থায় একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। ইতিবাচক মনোভাবই পারে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে।

 

লেখক : কলামিস্ট শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ
ডা. ফজলুল-হাজেরা ডিগ্রী কলেজ, চট্টগ্রাম।