সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮, ১০ বৈশাখ ১৪২৫
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

ছেলেরা সিনিয়র হলে জুটে যায়, মেয়েরা সিনিয়র হলে ভেঙ্গে যায়

শামসুজ্জোহা বিপ্লব | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2016-12-09 00:36:02

ভার্সিটিতে ফার্স্ট ইয়ার এবং সেকেন্ড ইয়ারের মেয়েদের ছেলেদের কাছে অনেক চড়া মূল্য থাকে। বেশিরভাগ ছেলেই ক্লাশের অথবা ভার্সিটির সুন্দরী মেয়েটার সাথে একটু ভাব বা বন্ধুত্ব গড়ার চেষ্টা করে কিন্তু কেনো জানি হয়ে ওঠে না। মেয়েরা বাচ্চা ছেলে মনেকরে এড়িয়ে চলে। এই ভাবুক মেয়েদের লেখাপড়া যত শেষের দিকে যায়। ধীরেধীরে তাদের মূল্য জ্যামিতিক হারে কমতে থাকে ।

দেখা যায় এই দুর্দিনে অনেক মেয়েই লক্ষী মেয়ের মতো বিয়ের পিঁড়িতে বসে যায়। আর মাস্টার্স শেষ করার পর তো আর কথাই নেই। মেয়েদের সেই চড়া মূল্যটা আর থাকে না। যদিও তাদের ডিগ্রীর মূল্য ততদিনে আকাশচুম্বী। আর যাদের বিয়ে হয়ে ওঠে না তারা নিজেকে বঞ্চিত, অবহেলিত ভাবতে থাকে। ঠিক যেনো বনলতা সেনের মতো অবস্থা। অপরদিকে ফার্স্ট ইয়ার এবং সেকেন্ড ইয়ারের ছেলেদের ভার্সিটিতে সুন্দরী মেয়েদের কাছে তেমন মূল্য থাকে না।

সবাই কেমন জানি এড়িয়ে চলে। সুন্দরী মেয়েটা তখন ভার্সিটির বড় ভাইদেরকে নিয়ে ব্যস্ত। বেশিরভাগ ফার্স্ট ইয়ার এবং সেকেন্ড ইয়ার ছেলেই এই কাহিনি দেখে নিজেদের অবহেলিত বঞ্চিত ভাবা শুরু করে। কিন্তু দেখতে দেখতে ভার্সিটি লাইফ যখন শেষের দিকে যায়। দিনেদিনে ছেলেদের মূল্য বাড়তে থাকে। জুনিয়র থেকে সিনিয়র হয়। ভার্সিটিতে নতুন নতুন ফার্স্ট ইয়ারের মেয়েরা আসে। তাদের সাথে একটা না একটা ভাব হয়েই যায়। মাস্টার্স শেষ করার পড়া সেই বঞ্চিত, অবহেলিত ছেলেদের মূল্য তখন আকাশচুম্বী।

ভার্সিটির এই ছেলেমেয়েদের কোল্ডওয়ার, দ্বন্দ্ব, অঘোষিত এবং নীরবে। সবাই দেখে বোঝে কিন্তু কেউ কিছু করতে বা বলতে পারে না। যেনো মনেহয় ভার্সিটির রিলেশন সিস্টেমটাই এরকম। এসব কাহিনির যে ব্যতিক্রম নেই তা কিন্তু নয়। অনেকেই দেখা যায় ভার্সিটিতে উঠার পর ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেটা কেমন করে যেনো ক্লাশের মেয়েটা বা অন্যকোনো ডিপার্টমেন্টের ফার্স্ট ইয়ারের সুন্দরী মেয়েটার সাথে ভাব করে নিয়েছে। ক্যাম্পাসের আনাচে কানাচে তখন চলতে থাকে রিলেশনের ঝড়ো হাওয়া। তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। এই জীবন তোমার আমার। বিন্দাস চলত থাকতে ফার্স্ট ইয়ার এবং সেকেন্ড ইয়ারের রিলেশনগুলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই রিলেশনগুলোর শেষ পরিণতি খুব বেশি ভালো হয় না। হঠাৎ দেখা যায় মাঝপথে গিয়ে হোঁচট খায়। ততদিনে মেয়েটার হয়তো অন্যকোনো ছেলেকে ভাল লেগে যায়। নয়তো মেয়েটা থার্ড ইয়ারে উঠতে উঠতে চারদিক থেকে বিয়ের সুপ্রস্তাব আসতে থাকে।

অনেকসময় ডিপার্টমেন্টের হ্যান্টসাম টিচারের মনে লেগে যেতে পারে। আর টিচারের ভাললেগে তো কোনো কথাই নেই। হঠাৎ করেই দেখবেন মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে সেই টিচারের সাথে। মেয়েটি বান্ধবী বা প্রেমিকা থেকে তখন হয়ে যায় শ্রদ্ধেয় ম্যাডাম। ছেলে তখন থার্ড ইয়ার বা ফোর্থ ইয়ারে পড়ে কিছুই করার নেই। প্রেমিকার বিয়ে থার্ড ইয়ার, ফোর্থ ইয়ারে পড়াশুনা করে আটকানো যায় না। একসময় অনেক স্বাদের রিলেশন ব্রেকআপ হয়ে যায়। মেয়েটার ভালো জায়গায় বিয়ে হয়ে যায়। ছেলেটার তখন হাতে হারিকেন। পড়াশুনা ছাদে উঠে যায়। যেটাকে আমরা বাংলা ভাষায় বলে থাকি ছ্যাঁকা খেয়ে থাকে। যে মেয়েটার ফার্স্ট ইয়ার এবং সেকেন্ড ইয়ারে কোনো রিলেশন হলো না বা রিলেশন করলো না। ছেলেদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরালো বা ভাব নিয়ে কাউকে পাত্তা দিলো না। মেয়েটি জুনিয়র থেকে যতো সিনিয়র হতে থাকে ধীরেধীরে তার রিলেশন হওয়ার সম্ভবনা কমতে থাকে।

কারন ততদিনে আরো কয়েক ব্যাচ জুনিয়র ভার্সিটিতে ঢুকে গেছে। এই মেয়েগুলোর আবেদন ফার্স্ট ইয়ার এবং সেকেন্ড ইয়ারে যে রকম আকাশচুম্বী ছিলো, সিনিয়র হতে হতে সেই আবেদন টা আর ছেলেদের কাছে থাকে না। আর বেশিরভাগ বড় ভাইরাও তখন ভার্সিটিতে থেকে বের হয়ে যায়। আর যাই হোক জুনিয়রদের সাথে তো আর রিলেশন করা যায় না। বড় জোর ছোটভাইদের সাথে বন্ধুত্ব বা আড্ডা দেয়া যেতে পারে। একসময় দেখতে পায় তার আশেপাশে যে ছেলেরা দিনরাত সময় দিতো, ঘোরাফেরা করতো তারা আর নেই। কোথায় যেনো হারিয়ে গেছে। দেখা যায় সেই ছেলেগুলো হয়তো অন্যকোনো জুনিয়র মেয়ের সাথে একটা ভাব করে ফেলেছে। নয়তো বিন্দাস একটা রিলেশন করে ফেলেছে জুনিয়র কোনো সুন্দরী মেয়ের সাথে।

আর এই মেয়েটি তখনো একাই থেকে যায়। এদিকে মেয়ের বয়স বাড়ার কারনে তখন বাবা মাও বিয়ের চাপ দিতে থাকে। তখন আর কি করা? আর যাই হোক বাবা মা'র কথা তো আর ফেলা যায় না। বিয়েতে রাজি হয়ে যায়। পাত্রের টাকা আছে, মাথায় চুল নেই। হ্যান্ডসাম, যাস্ট বয়সটা একটি বেশি বত্রিশ পেরিয়ে পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। ব্যাংকের সিনিয়র ম্যানেজার নয়তো কোম্পানির ভাল কর্মচারী। মেয়েভাবে তাতে কি হয়েছে চলবে আমার। বিয়ের পর মেয়ে বারবার স্বামীর সাথে ক্লোজ ছবি দিয়ে বোঝাতে চায়।

আমার টাকলু স্বামীকে নিয়ে বেশ ভালই আছি। নামীদামী হোটেলের চেকইন থাকে। ক্যাপশন থাকে, ও আমাকে অনেকবেশি টেককেয়ার করে। যে ছেলেটার ফার্স্ট ইয়ার এবং সেকেন্ড ইয়ারে কোনো রিলেশন হলো না। সেও কিন্তু বসে থাকে না চেষ্টা চালিয়ে যায়। হয়তো অনেকের কাছেই অবহেলিত, বঞ্চিত হয়। বান্ধবীদের প্রপোজাল দিলে শুধু বন্ধু ভেবেছে বলে মুচকি হাসি দিয়ে ফিরিয়ে দেয়। কিছু বলার থাকে না। যাকে একবার ভালবাসার চোখে দেখা যায়। তার পাশাপাশি থেকে শুধু বন্ধু হিসেবে সম্পর্কটা সামনে টেনে নেয়া, বাস্তবিকপক্ষে অনেক কঠিন হয়ে যায়। দেখা যায় কি এক অজানা কারনে যেনো শেষ পর্যন্ত বন্ধুত্বটাও টিকে না। এই অবহেলিত, বঞ্চিত ছেলেগুলো যখন থার্ড ইয়ার, ফোর্থ ইয়ার বা মাস্টার্সে উঠে যায়।

তারা কিন্তু বেশিরভাগই আর একা থাকে না। কেমন করে যেনো একটা ফার্স্ট ইয়ার বা সেকেন্ড ইয়ারের জুনিয়র লাল টুকটুকে একটা মিষ্টি মেয়ে জুটিয়ে ফেলে। আসলে ভার্সিটির বড় ভাইদের বা ডিপার্টমেন্টের বড় ভাইদের প্রতি ফার্স্ট ইয়ার এবং সেকেন্ড ইয়ারের মেয়েদের একটা আলাদা আকর্ষণ থাকে। আর ছেলেটা যদি ডিপার্টমেন্টের ফাস্ট বয় বা সেকেন্ড বয় হয়। তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই। ছেলেরা সিনিয়র হলে বসে থাকে না জুটে যায়। মেয়েরা সিনিয়র হলে মানসিকভাবে ভেঙ্গে যায় অবহেলিত হতে থাকে। যদিও মেয়েদের মন স্বচ্ছ তরল পদার্থের মতো। কখন গড়ে কার দিকে পড়ে যায় তার ঠিক নেই। তারপরেও বাস্তবক্ষেত্রে দেখা যায় বেশিরভাগই এই সিনিয়র জুনিয়র রিলেশনগুলোই টিকে যায়। ছেলে যখন অনার্স মাস্টার্স শেষ করে বেড়িয়ে যায় ক্যারিয়ারের খোঁজে। মেয়ে তখন ফার্স্ট ইয়ার থেকে সেকেন্ড ইয়ার অথবা সেকেন্ড ইয়ার থেকে থার্ড ইয়ারে উঠে,যায়।

ছেলে কিছুদিন পরেই ভালো চাকরি পেয়ে গেলে হয়তো পাকাপাকিভাবে বিয়েটাও হয়ে যায়। মেয়ের অনার্স মাস্টার্স পাশ হতেহতেই ছেলে তখন ক্যারিয়ারে স্টাবল একটা পজিশনে চলে যায়। সংসার জীবনে আশাকরা যায় তারা ভালই থাকে। হাজার হোক ভালবাসার বিয়ে তো। কিছুদিন পরেই কোল উজাড় করে নেমে আসে ফুটফুটে হাসিমুখ। ভার্সিটিতে এই রিলেশনগুলোর বাইরেও কিছু ছেলেমেয়ে থাকে। যাদের কোন গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ড থাকে না। যারা ভার্সিটির কালচার, নাটক, সংগীত, আবৃত্তি নিয়ে পুরো ভার্সিটি লাইফ টা কাটিয়ে দেয়। তাদের কাছে ভালবাসা মানেই কালচার, বন্ধুত্ব, আড্ডাবাজি। ভার্সিটিতে রেজাল্টও তেমন ভাল থাকে না। টেনেটুনে ফার্স্ট ক্লাশ। ভার্সিটিতে আরো একদল পড়ুয়া ছেলেমেয়ে থাকে।

যাদের না পদচারণা থাকে কালচারে না থাকে রিলেশনে। পড়াশুনায় এদের কাছে জীবনের ধ্যান জ্ঞান। আর বন্ধু সংখ্যা থাকে নিতান্তই হাতেগোনা। আর হ্যা ডিপার্টমেন্টের ফার্স্ট বয় বা গার্ল কিন্তু এরাই হয়। ক্যারিয়ারে সফলতাও পেয়ে যায়। দেখা যায় ভার্সিটিতে অনার্স মাস্টার্স শেষ করে দিব্যি টিচার হয়ে বসে আছে। আর আপনি তখন হন্য হয়ে খুঁজছেন একটা চাকরি। নয়তো বিসিএস নামক সোনার হরিণের পিছনে ছুটছেন। আসলে ভার্সিটির ছেলেমেয়েরা ক্যারিয়ারে কেউই বসে থাকে না। দু'দিন আগে পরে চাকরি জুটিয়ে ফেলে। নয়তো দেখবেন নিজেই উদ্যোক্তা হয়ে বসে আছে। ভাল থাকুক আড্ডাবাজ, বিন্দাস ছেলেমেয়েগুলো। ভাল থাকুক অবহেলিত মেয়েটা এবং বঞ্চিত ছেলেটা। ভাল থাকুক ফার্স্টবয় ছেলেটা এবং ফার্স্টগার্ল মেয়েটা। ভাল থাকুক ভার্সিটির সিনিয়র জুনিয়র মিষ্টিমধুর রিলেশন। ভাল থাকুক ক্যাম্পাসের কোল জুড়ে নেমে আসা হাসিমুখ।

 

শামসুজ্জোহা বিপ্লব
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।