শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১২ ফাল্গুন ১৪২৪
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

পড়ালেখা থেকে মুক্তির গল্প ॥ শামসুজ্জোহা বিপ্লব

শামসুজ্জোহা বিপ্লব | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2017-01-27 18:49:30

ভার্সিটি জীবনে থিউরি পরিক্ষা নামক প্যারাটা শুরু করেছিলাম কোর্স নাম্বার : ১০১, ফিজিক্যাল কেমেস্ট্রি আর আজ মাস্টার্সের থিউরি পরিক্ষা শেষ করে আসলাম কোর্স নাম্বার : ৫১০৬, বায়োফিজিক্যাল কেমেস্ট্রি দিয়ে। আজ খুব মনেপড়ছে ফার্স্ট ইয়ারের সেই পরিক্ষার দিনগুলোর কথা।

ভার্সিটিতে উঠার পরেই পড়াশুনা নিয়ে টেনশনে পড়ে যাই ইংরেজি ভার্সনের পড়াশুনা নিয়ে। বড় ভাইদের কাছে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিলাম। ভাই ইংরেজি ভার্সনে পরিক্ষা দেবো কিভাবে, আমরা তো ইন্টারে বাংলায় পড়াশুনা করে এসেছি। মনেপড়ে যেখানে একটা ইংরেজি রচনা, প্রাগ্রাফ মুখস্থ করতে সপ্তাহ, পনেরদিন লেগে যেতো। সেখানে ভার্সিটিতে উঠে এতোএতো পড়া ইংরেজিতে পড়বো কিভাবে, চিন্তায় পড়ে গেলাম। একসময় ভেবেছিলাম ভার্সিটির এই ইংরেজি ভার্সনের সমস্যা দুর করার জন্য কোনো ইংলিশ কোর্সে ভর্তি হয়ে যাবো কিন্তু হন্তদন্ত হয়ে এই ভার্সন সমস্যা নিয়ে যখন বড়ভাইদের কাছে যাই। বড় ভাইরা আমাদের আশার বাণী শুনিয়ে দেয়, আমাদের অভয় দেয়। ইংরেজি ভার্সন নিয়ে টেনশনের কিছু নাই। তোমার মতো সবাই একইরকম। যা পড়বে তা একটু লিখবে, কয়েকদিন প্রাকটিস করলেই সবঠিক হয়ে যাবে। আসলে হয়েছিলোও তাই। পরিক্ষার আগে যখন পড়াশুনা শুরু করে দেই এবং বেশিবেশি লিখতে থাকি একসময় দেখি ইংরেজি ভার্সনের সমস্যা ধীরেধীরে দূর হয়ে গেছে।

পরিক্ষার হলে ইংরেজিকে তখন বাংলার মতো মনেহয়, খাতায় লিখতে থাকি সাদা পাতা কালো করি। তেমন কোনো সমস্যা হয় না। ভার্সিটিতে উঠার আগে ভেবেছিলাম ভার্সিটিতে চান্স পেলে প্রতি ইয়ারে রেজাল্ট ফাটিয়ে দেবো কিন্তু ভার্সিটিতে উঠে রেজাল্ট ফাটাতে গিয়ে দেখলাম। মাঝেমাঝে নিজেরই ফেটে যাওয়ার অবস্থা তৈরি হয়েছে। ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার পর দেখা গেলো পড়াশুনা সব গাছের আগায় উঠেছে। নতুন পরিবেশ একটু দেখতে শুনতে বন্ধুদের নিয়ে গা ভাসাতেই ফার্স্ট ইয়ারের পরিক্ষা চলে আসলো। ভাবলাম আমি তো ইংরেজিতে একটু দুর্বল, পড়াশুনাটা একটু আগেই শুরু করি। ঠিক মনে আছে ফার্স্ট ইয়ারে পরিক্ষার তিন মাস আগে থেকে পড়াশুনা শুরু করেছিলাম। ফার্স্ট ইয়ারের ফার্স্ট পরিক্ষা যেদিন দেই, সেদিন পরিক্ষা দিয়ে তো চরম হতাশ। যা কমন পেয়েছি ইংরেজিতে লিখতে পেরেছি কিন্তু প্রশ্নই তেমন কমন পাই নি। লিখবো আর কি? বুঝতে পারলাম ভার্সিটির পড়াশুনার সিস্টেম আমার সিস্টেমের সাথে মিলছে না। তাই সব পড়েও প্রশ্ন কমন পাচ্ছি না।

ভার্সিটির পরিক্ষার প্রশ্নের সিস্টেম বুঝতে বুঝতেই ফার্স্ট ইয়ারের পরিক্ষা শেষ হয়ে গেলো। ভাবলাম ফার্স্ট ইয়ারে রেজাল্ট তো তেমন ভালো হবে না, সেকেন্ড ইয়ারে রেজাল্ট ফাটিয়ে দিবো। ফার্স্ট ইয়ারের রেজাল্টের দিন দেখলাম, না রেজাল্ট তেমন খারাপ হয় নি। ফার্স্ট ইয়ার পরিক্ষা শেষ করে কিছুদিন গা এ পাঙ্খা লাগিয়ে ঘুরলাম, মাঝখানে রেজাল্ট, রেজাল্ট নিয়ে বন্ধুদের সাথে গালগপ্প । এসব করেই কিছুদিন চলে গেলো। দেখতে দেখতেই কেমন করে যেনো সেকেন্ড ইয়ারের ফাইনাল পরিক্ষাটাও সামনে চলে আসলো। খেয়াল করে দেখলাম তখন পরিক্ষার মাত্র একমাসের কিছু বেশি সময় বাকি। আমার এখন পর্যন্ত, নোট, শীট, লেকচার, প্রশ্ন কিছুই কালেক্ট করা হয় নি। শুরু হলো দৌড়াদৌড়ি তড়িঘড়ি করে সবকিছু কালেক্ট করতে করতে পরিক্ষা একদম মাথার উপর চলে আসলো। পুরোপুরিভাবে পড়াশুনা শুরু করতে গিয়ে দেখলাম, পরিক্ষার মাত্র পনের বিশ দিন বাকি আছে। এখনো কিছুই পড়া হয় নি। শুরু করলাম রাতদিন একাকার পড়াশুনা কিন্তু মনের মতো পড়াশুনা করতে পারলাম না। ভাবলাম যা হয়েছে, হয়েছে।

তা নিয়েই পরিক্ষা দেবো। আল্লাহর নাম নিয়ে সেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল পরিক্ষায় বসে পড়লাম। পরিক্ষার মাঝে গ্যাপ থাকার কারনে দেখলাম সেকেন্ড ইয়ার পরিক্ষা তেমন খারাপ হয় নি। যা হবার হবে। মনকে এই বলে সান্ত্বনা দেই। আমি তো ফার্স্ট হওয়ার জন্য পড়াশুনা করছি না। যা রেজাল্ট হবে, আমার চলবে। সেকেন্ড ইয়ার পরিক্ষার রেজাল্ট দিলো। রেজাল্ট দেখে খুব বেশি খুশিও হতে পারি না আবার মন খারাপ করেও থাকতে পারি না। যাকে বলে সুবিধাবাদী রেজাল্ট। মনকে এই বলে সান্ত্বনা দেই, যা পড়াশুনা করছো এর চেয়ে ভালো রেজাল্ট করা সম্ভব না। ভাবলাম এতো চিন্তা বাদ থার্ড ইয়ারে ভাল করার চেষ্টা করতে হবে। থার্ড ইয়ার ছিলো আমার জীবনের ট্রাজেডি। থাক আজ ট্রাজেডির গল্প বলে লাভ নাই। জীবনে যদি কখনো সফল হতে পারি।

সেদিন না হয় থার্ড ইয়ারের ট্রাজেডির গল্প শুনাবো। থার্ড ইয়ারের পরিক্ষার সময় দেখলাম সেকেন্ড ইয়ারের ঘটনার পুনরাবৃত্তি। পড়াশুনা শুরু করার চিন্তাভাবনা করছি। এমন সময় দেখলাম পরিক্ষার মাত্র দশ পনেরদিন বাকি আছে। কি আর করা! আবার নোট, শীট, প্রশ্ন, হাবিজাবি কালেকশন করে পড়াশুনা শুরু করলাম। থার্ড ইয়ার পরিক্ষা শেষ করে দেখলাম। পরিক্ষা এক্কেবারে খারাপ হয় নি। থার্ড ইয়ারের রেজাল্টের দিন খুব বেশি প্রত্যাশা ছিলো না। ভাবলাম গতানুগতিক রেজাল্ট হবে। আগের দুই ইয়ার পার করে এসেছি। এটাও হয়ে যাবে। হলোও তাই। যারা ফার্স্ট হয় তারা সারাবছর পড়াশুনার সাথে লেগে থাকে। নিজেকে খুব ভালভাবে বিশ্লেষণ করে দেখলাম। ভার্সিটিতে আমার পক্ষে এইভাবে পড়াশুনার সাথে সারাবছর লেগে থাকা সম্ভব নয়। তাই ফার্স্ট হওয়ার চিন্তা বাদ। ফোর্থ ইয়ারের পরিক্ষা যখন মাথার উপর এসে ঘুরপাঁক খাচ্ছে। খেয়াল করে দেখলাম নিজের ভিতর তেমন কোনো পরিক্ষাভীতি কাজ করছে না আর টেনশনও লাগছে না

 ভাবছেন এবার অনেক আগে থেকে পড়াশুনা শুরু করেছি। তাই না। আসলে ব্যাপারটা তা না। বারবার মনেহলো ভয়ের কি আছে? তিন ইয়ার সম্মানের সহিত পার হয়ে গেছে। ফোর্থ ইয়ার এমন কি! এটাও উতরে যেতে পারবো। আসলে ততোদিনে আমি বুঝে গেছি ভার্সিটিতে আমি কী ধরনের রেজাল্ট করতে পারবে? আমি আমার সীমা সম্পর্কে অবগত হয়েছি। অভিজ্ঞতা আর আত্মবিশ্বাস বলে একটা কথা আছে। মুলত এটাই প্রয়োগ করেছিলাম ভার্সিটির ফোর্থ ইয়ারের পরিক্ষার সময়। ভালো রেজাল্ট করার প্রত্যাশা, ডিপার্টমেন্টে ফার্স্ট হওয়ার চিন্তার ভূত ততোদিনে মাথা থেকে নিজেই নেমে গেছে। আমাকে নামাতে হয় নি। ফোর্থ ইয়ারের একটা একটা করে পরিক্ষা দিয়ে আসি আর ভাবি একটা সার্টিফিকেট পাইলেই হলো। অনার্স পাশ করতেছি এটাই বড়কথা। আর মনকে বারবার সান্ত্বনা দেই। একটা রেজাল্ট কখনো ক্যারিয়ারে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। অনেকেই তো ডিগ্রী অর্জন না করেও, ড্রপআউট হয়েও জীবনে সফল হয়েছে। আমরাও হবো, এতো ভয়ের কিছু না। ফোর্থ ইয়ার রেজাল্ট নিয়ে খুব বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিলো না। তাই রেজাল্ট নিয়ে টেনশন, ভয়ের কিছু ছিলো না। ব্যাপারটা এমন ন্যাংটার না আছে বাটপারের ভয়।

যতোটা স্বপ্ন নিয়ে ভার্সিটিতে এসেছিলাম, ততটা ভালো হবে না জানি। তাই নিজেকে আগে থেকেই সান্ত্বনা দিয়ে রেখেছিলাম। অনার্সের রেজাল্টও মোটামোটা একটা হিশেব করে রেখেছিলাম কিন্তু রেজাল্টের দিন দেখলাম তার চেয়ে ঢ়েঁর অনেক ভালো রেজাল্ট হয়েছে। অনার্সের মোট সিজিপিএ রেজাল্ট হয়তো আহামরি হয় নি কিন্তু দেখলাম সম্মানের সহিত সম্মান পাশ হয়ে গেছে। রেজাল্ট দেখে মন খারাপ করার প্রশ্নই আসে না। রেজাল্ট পাওয়ার পর মনেহলো অনেক কষ্ট সাধনার আমার এই অনার্সের রেজাল্ট । এই একটা সার্টিফিকেটের জন্যই আমাকে কাটাতে হয়েছে অনেকঅনেক বিনিদ্র রজনী, প্রতিবছর দুই তিন মাসের পরিক্ষায় চোখের পাতায় পড়েছিলো কালোদাগ। সবকিছুকে ছাপিয়ে অনার্সের রেজাল্ট হাতে পাওয়ার পর মনেহলো, অবশেষে আমি পাইলাম আমি ইহাকে পাইলাম।।

অনার্স শেষ হওয়ার পর মাস্টার্সের পড়াশুনা নিয়ে তেমন টেনশনের কিছু ছিলো না। মাস্টার্স পরিক্ষার সামনে আসতেই এবার কিভাবে কিভাবে যেনো এক মাস আগে থেকেই মাস্টার্সের সব নোট, শীট, প্রশ্নগুছিয়ে রেখেছিলাম। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের বাইশ তারিখ থেকে থিউরি পরিক্ষা দেওয়া শুরু করে আজ ২০১৭ সালের জানুয়ারির বাইশ তারিখ থিউরি পরিক্ষা শেষ করলাম। হঠাৎ মনেপড়লো অনার্সের প্রথম থিউরি পরিক্ষা কোর্স নাম্বার : ১০১, ফিজিক্যাল কেমেস্ট্রি খারাপ হলেও মাস্টার্সের শেষ থিউরি পরিক্ষা কোর্স নাম্বার : ৫১০৬ , বায়োফিজিক্যাল কেমেস্ট্রি কিন্তু একেবারে খারাপ হয় নি। কথায় বলে শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। শেষটা ভালো হবে কি না এখনো জানি না।

আর ভালো হলে কতটা ভালো হবে তাও জানি না। রেজাল্ট দিলেই জানা যাবে মোল্লার দৌড় কতদুর? যাইহোক পরিক্ষা দেওয়া শেষ করে বারবার মনেহলো আমি একাডেমিক লেখাপড়া থেকে মুক্তি পেলাম। আমি তো আজীবন এই পড়ালেখা থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছিলাম। অবশেষে পেয়ে গেলাম মুক্তি, একাডেমিক পড়ালেখা থেকে মুক্তি। কিন্তু আমি জানি এইদেশে পড়ালেখা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় নাই। এই মুক্তিই শেষ মুক্তি নয়।।।

 

 

শামসুজ্জোহা বিপ্লব,

রসায়ন বিভাগ, চবি।।