শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১২ ফাল্গুন ১৪২৪
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

আড্ডা, গান, আর রাজনীতির নাম ঝুপড়ি

শামসুজ্জোহা বিপ্লব | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2017-03-01 12:00:15

পাহাড়ে ঘেরা সবুজে ভরা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লালাভূমি আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় । সেই সৌন্দর্যের আরেকটি মনোমুগ্ধকর দর্শনীয় স্থান ক্যাম্পাসের ঝুপড়িগুলো। সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের আনোগোনা লেগে থাকে ঝুপড়ির মাঝে। বিকেল হলেই এক চিলতে রক্তিম আভা এসে খেলা করে ঝুপড়ির টেবিল আর চায়ের কাপে।

আমাদের প্রতিটি ঝুপড়ি যেনো এক একটা টিএসসি, একেকটি কফি হাউস। গান, আড্ডা, রাজনীতি, আন্দোলন, খাওয়া সবকিছুই শুরু হয় এই ঝুপড়িগুলোকে কেন্দ্র করে। চবিতে রয়েছে এরকম বেশ কয়েকটি ঝুপড়ি। যেমন লেডিস হলের ঝুপড়ি, কলার ঝুপড়ি, মেরিন সাইন্সের ঝুপড়ি, সমাজবিজ্ঞান ঝুপড়ি, রব হলের ঝুপড়ি। এই ঝুপড়িগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ঝুপড়ি হছে লেডিস হল এবং কলার ঝুপড়ি।

চবির শিক্ষার্থীদের টেবিল চাপড়িয়ে গান আর সুরের মূর্ছনায় ভেসে উঠার গল্প কে না জানে? কয়েকজন বন্ধু, ভাই ব্রাদার একসাথে হলেই কাপজয়ী গানের সুর ভেসে আসে ঝুপড়িগুলো থেকে। ক্যাম্পাসের ঝুপড়িগুলো দেখতে ঠিক টিনের ছাউনি দেয়া এবং টিন দেয়া ঘেরা এক ধরনের ছোটছোট দোকান ঘর এবং সামনেই সজ্জিত থাকে টেবিল বেঞ্চ। সকাল হলেই ভীড় জমতে থাকে আলী ভাই, নাজিম ভাই, জসিম ভাইয়ের ঝুপড়ির দোকানগুলোতে। ক্লাশে যাওয়ার আগে চায়ে এক কাপ চুমুক আর দুটো সিংগারা খেয়ে অনেকেই চলে যায় ক্লাশে করতে। আবার ক্লাশে র মাঝে বিরতি অথবা ক্লাশ শেষে আবারো ভীড় জমায় এই ঝুপড়িগুলোতে। শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েদের পদচারণাও কম নয় এই ঝুপড়ির আড্ডায়। দুপর হয়ে আসলে ক্ষুধায় যখন পেট চোঁ চোঁ করবে, তখন আপনি এই ঝুপড়িগুলোতে খেতেও পারবেন পেটপুরে। ঝুপড়ি পা রাখলেই আপনার কানে ভেসে আসবে কোনো না কোনো টেবিল থেকে কালজয়ী, প্যারোডি গান।

এই গানের সুরের মাঝেই অনেকের দেখা মেলে ভাললাগা এবং ভাললাগা মানুষের। কেউ কেউ চোখের ভাষায় খুঁজে নেয় প্রিয়তম মানুষকে। কারো কারো হৃদয়ের লেনাদেনা হয়েও যায় এই ঝুপড়ির মাঝেই। বন্ধুদের আড্ডা, বার্থ ডে পার্টি সবকিছুই জমে উঠে চবির ঝুপড়িতে। ক্যাম্পাসের ঝুপড়িগুলোকে বলা হয় রাজনীতির সূতিকাগার। বেতন ভাতা বৃদ্ধি এবং যেকোনো ছাত্র আন্দোলন শুরু হয় এই ঝুপড়িগুলো থেকেই। বর্ষাকালে ঝুপড়ি গুলো এক অনন্য রুপ ধারন করে। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ, টেবিল চাপড়িয়ে বৃষ্টির গান আর হাতে চায়ের কাপ যেনো এক মোহনীয় মনোমুগ্ধকর পরিবেশ গড়ে তোলে। ঝুপড়িতে বন্ধুদের সাথে কার্ড খেলতে খেলতে কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়, খেয়ালেই করা হয়ে উঠে না। দিনের আলো নিভে যাওয়ার সাথেসাথে ঝুপড়ির সৌন্দর্য সময়ে সময়ে বদলাতে থাকে। রাতে ঝুপড়িগুলো ধারন করে এক অনন্য রুপ।

এক চিলতে জোসনার আলো শরীরে এসে পরশ বুলিয়ে দেয়। ঝুপড়িতে আড্ডা, গান, খেলা চলে রাত অব্দি। রাতে বাড়তে থাকলে একসময় ঝুপড়ির আড্ডার পর্দা নেমে আসে। রুমে ফিরে যায় শিক্ষার্থীরা। ফার্স ইয়ার সেকেন্ড ইয়ার ছেলেদের সবচেয়ে বেশি আনোগোনা দেখা যায় এই ঝুপড়িগুলোতে। ধীরেধীরে সময় বাড়তে থাকলে ঝুপড়ির প্রতি মায়াটাও দিনদিন বাড়তে থাকে। একসময় জুনিয়ররা জায়গা করে নেয় সিনিয়রদের ঝুপড়ির জায়গা। এই কাল উত্তীর্ন ঝুপড়ি, এই হাতের তালে বাজানো টেবিল, পুরনো চায়ের কাপ সবকিছুই পরে থাকে আগের মতো

 শুধু ঝুপড়িতে পা রাখা মানুষগুলো সময়ের সাথে সাথে বদলাতে থাকে, সময়ে থেকে সময়ে। শিক্ষাজীবন শেষে ক্যাম্পাসের ঝুপড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় হৃদয়ে তৈরি হয় চিনচিনে একটা ব্যথা। তাইতো বিদায় বেলায় অনেককেই দেখা যায় ঝুপড়ির দিকে তাকিয়ে, চোখ বেঁয়ে দু'ফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে পড়তে। অব্যক্ত কথা ভেসে আসে বুক চিড়ে, ভালো থাকিস ক্যাম্পাস, ভালো থাকিস ক্যাম্পাসের ঝুপড়ি।।

 

লেখক: শামসুজ্জোহা বিপ্লব