সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮, ১০ বৈশাখ ১৪২৫
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

বিদায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শামসুজ্জোহা বিপ্লব | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2017-03-12 21:59:12

বিদায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়বিদায় ক্যাম্পাস..! বিদায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়...! ভার্সিটির সোনালী জীবনটা শুরু হয়েছিলো প্রায় ২০১০ সালের দিকে, অনেক কষ্ট সাধনা করে ভর্তি যুদ্ধে টিকে যাওয়ার পর পড়াশুনা করার জন্য এসেছিলাম এই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরিচিত বলতে তেমন কেউই ছিলো না, অজানা ঠিকানায় পারি দিয়েছিলাম এই দূরদূরান্তের পথ।

এই ভার্সিটিতে পড়ার সুপ্তবাসনা নিয়ে ঢাকা থেকে ট্রেনে রওয়ানা দিয়েছিলাম চট্টগ্রামে, চোখেমুখে ছিলো অজানা আশংকা ট্রেন চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে আসার পর অপেক্ষায় ছিলাম ভার্সিটির শাটল ট্রেনের, স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতেই আমার মতো ভর্তি যুদ্ধে টিকে যাওয়া কয়েকজনের সাথে পরিচয় হলো, সবারই কোনো না কোনো পরিচিত আত্মীয় বড় ভাই আছে কিন্তু আমার তো কেউ নেই শাটল ট্রেনে আসতে আসতেই বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম, ভার্সিটি যাচ্ছি কিন্তু থাকবো কোথায়?

মাথার মধ্যে চিন্তা বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিলো কিন্তু নিরাশ হলাম না, ভাবছিলাম একটা না একটা ব্যবস্থা হয়েই যাবে শাটল ট্রেন থেকে নেমে জিরো পয়েন্টে গিয়ে ব্যাগ নিয়ে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে রইলাম কিন্তু কিছুতেই কোনো ব্যবস্থা হচ্ছিলো না তাই পাশেই এক জায়গায় ঠায় বসে রইলাম আর ভাবছিলাম এখন কি করবো? কয়েকজন বন্ধুবান্ধবকে ফোন দিলাম কারো কোনো আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধব বড় ভাই আছে কি না? বেশ কয়েক জায়গায় নিরাশ হলেও একসময় একটা ব্যাবস্থা হয়ে গেলো ঢাবির এক ফ্রেন্ডের মামা এখানে পড়াশুনা করে এপ্লাইড ফিজিক্সে, ফোন নাম্বার নিয়ে তার সাথে কথা বললাম একসময় আমানত হল থাকার ব্যবস্থা হলো সেই থেকে ছাত্র হিশেবে ভার্সিটি হলএ থাকা শুরু ভার্সিটির অফিশিয়ালভাবে ছাত্র হওয়ার আগেই আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে বিকেল হলেই ক্যাম্পাস দাঁপিয়ে বেড়াই অনেকরাত অব্দি

দেখতে দেখতে ভর্তি পরিক্ষার টিকে যাওয়ার ভাইভার ডেট চলে আসলো ভাইভা দিয়েই এই রসায়ন বিভাগে ভর্তি হয়ে গেলাম সেই থেকে ভার্সিটির ছাত্র হিশেবে নাম লেখালাম ক্যাম্পাসের পাতায় ভার্সিটির ছাত্র হিশেবে ক্যাম্পাসে কাটিয়েছি অনেকটা সোনালী সময় এই ক্যাম্পাসে যে স্বপ্নবাসনা নিয়ে ঢুকেছিলাম ক্যাম্পাসে ঝুপড়িতে প্রথম যেদিন বসেছিলাম, সেই দিনটার কথা আজও স্মৃতির পাতায় জ্বলজ্বল করছে, কাটা পাহাড়ের রাস্তায় গলা ছেড়ে যেদিন আমার মতো বোকা ছেলে হেঁড়ে গলায় গান ধরেছিলো, "শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আশে, অঝরে নামবে বুঝি শ্রাবণে....", সেই রাতটার কথাও আজও মনে পড়ছে, চাকসুতে যেদিন বন্ধুদের নিয়ে লাইন ধরে স্বল্পমূল্যে পরাটা আর ডাল ভাজি খেতে গিয়েছিলাম সে দিনটাও মাথার ভিতর উঁকি দিচ্ছে বারবার

বরাবরেই ভদ্র ছেলের তকমা গায়ে লাগানো ছিলো বলে, লেডিস হলের দিকে তেমন যেতাম না কিন্তু একদিন বন্ধুদের নিয়ে লেডিস হলের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম সেই দিনই প্রথম দেখলাম সন্ধ্যা হলেই প্রীতিলতা হলের মেয়েরা ছাদের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, আর গেটের সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া ছাত্রদের দিকে চেয়ে থাকে কিন্তু আমরা লজ্জায় তাদের দিকে চেয়ে থাকার সাহস পেলাম না শুধু আঁড়চোখে দেখে বুঝতে পারলাম মেয়েরা উপর থেকে আমাদের মনে হয় দেখছে

কথা ভাবতেই বুকের ভিতর দুরুদুরু আর বাম পায়ের কাঁপুনি শুরু হয়ে গেছিলো সেই দিনের কথাগুলো ভাবতেই গা টা এখনো শিউরে উঠছে ভার্সিটির ক্যাম্পাস জীবনটা ঠিক আনন্দ, উচ্ছ্বল, ভাললাগায় কাটতেছিলো কারন সবকিছুই আমাদের কাছে নতুন ছিলো নিজের ক্যাম্পাসকে যতোই দেখতাম ততোই মুগ্ধ হতাম ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য, এই দীর্ঘ সময় আমাকে বিমোহিত করে রেখেছিলো কখনো বুঝতে পারি নি এই ক্যাম্পাসে আমি এতোটা দীর্ঘসময় কাটিয়ে ফেলেছি কখনো ক্যাম্পাসের প্রতি খারাপ লাগা তৈরি হয় নি

ক্যাম্পাসের জীবন কেটেছে বিন্দাস তবে মাঝেমাঝে কিছু অনিচ্ছাকৃত ঝড়ঝাপটা আমার জীবনে এসেছিলো কিন্তু সেগুলো কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেছি নিজের মতো করে ক্যাম্পাসে তেমন কোনো পিছুটান ছিলো না কিন্তু নিজের ক্যাম্পাস, শিক্ষক, ছোটভাই, বড় ভাইদের মায়া এবং ভালবাসাটা ছিলো অনেক বেশি সেটা কাটিয়ে উঠতে অনেক কষ্ট হবে জানি কিন্তু জীবনের প্রয়োজনে মাঝেমাঝে নিজের মনটা অনেকবেশি কঠিন হয়ে যায়

মায়া ছেড়ে পারি জমাতে হয় নতুন কোনো অজানা ঠিকানায় ভার্সিটির থেকে বিদায়ের বিষাদ সুর অনেকদিন ধরেই টুংটাং টুংটাং করে বাজতে ছিলো আজ তার ষোলকলা পূর্ণ হলো ভার্সিটি জীবনের সমস্ত লেখাপড়ার ইস্তফা ঘটিয়ে আজ ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাচ্ছি ঢাকায়, জীবনের প্রয়োজনে এই জীবনের প্রয়োজনেই একদিন এসেছিলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, নিজেকে ভালো মানুষ হিশেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশায় কিন্তু আজ যাওয়ার বেলায় বুঝতে পারছি না ঠিক কতটা ভালো মানুষ হতে পেরেছি? ক্যাম্পাসে বন্ধুবান্ধব, ছোটভাই, বড়ভাইদের পেয়েছিলাম অনেক আপন করে

ক্যাম্পাসের পরিচিত ছোটভাই, বড়ভাইদের নিজের ভালোটুকু উজাড় করে দিতে চেয়েছি জানি না কতটুকু দিতে পেরেছি? ছোটভাইদের কাছে থেকে সম্মান এবং বড়ভাইদের স্নেহ পেয়েছি আমার প্রত্যাশার চাইতেও অনেক বেশি রক্তের সম্পর্কের না হয়েও যে, পর মানুষকে বুকের গভীরে ভালবাসার জায়গায় স্থান দেয়া যায়, সেটা এই ক্যাম্পাস থেকেই শিখে গেলাম ক্যাম্পাস থেকে কি পেলাম আর কি পেলাম না, সে হিশেব করার সময় এখনো আসি না তবে এটুকু বলতে পারি, ক্যাম্পাস থেকে নিয়ে গেলাম অনেক কিছু কিন্তু ক্যাম্পাসকে ফিরিয়ে দিতে পারলাম না কিছুই

তবুও ক্যাম্পাসটা নিঃস্বার্থভাবে আমাকে ভালবেসে গেছে হয়তো আরো কিছুদিন ক্যাম্পাসের মায়া এবং ভালবাসায় জড়িয়ে থাকা যেতো কিন্তু সে সময়টা আর হয়ে উঠলো না গতকালই মাত্র মাস্টার্সের সর্বশেষ প্রজেক্টের ভাইভা শেষ হয়েছে ভেবেছিলাম কিছুদিন একটু রিলাক্সে ক্যাম্পাসে থাকবো, লেখাপড়া নামক প্যারা ছাড়া কিন্তু একটিদিনও থাকতে পারলাম না অনেকের সাথে দেখা করার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বো সময়ের সংকুলানের জন্য শেষ দেখাটাও করে যেতে পারলাম না এটা ভাবতেই নিজেরই ভীষন খারাপ লাগছে তবুও নিজের মনকে এই বলে সান্ত্বনা দিচ্ছি, আবার দেখা হবে সবার সাথে কারনে আর অকারনে, চাপা কোনো অভিমানে, সময়ে কিংবা অসময়ে আজ শেষ বিদায় বেলায় ক্যাম্পাসটা ছেড়ে যাওয়ার সময় বুকের ভিতরটা কেমন জানি বারবার মোচড় দিয়ে উঠছে, হৃদয়টা ব্যথিত হয়েছে বারবার কিন্তু দেখলাম আমার কিছু করার নাই

সময় হলে সবাইকেই একসময় চলে যেতে হয় এটাই জগতের নিয়ম একথা জানি এই ভাললাগা এবং ভালবাসার ক্যাম্পাসে আর কখনো ছাত্র হিশেবে আসা হবে না, আসবো হয়তো ঘুরতে ফিরতে অথবা কোনো অনুষ্ঠানে অতিথি হিশেবে, প্রাক্তন ছাত্রের বেশে কিন্তু তখন এই ক্যাম্পাস লাইফের আমেজটা আর থাকবে না, থাকবে না বন্ধুদের সাথে ঝুপড়ির আড্ডা, থাকবে না অন্ধকারে কাটা পাহাড়ের রাস্তায় গলা ছেড়ে গান নামক অত্যাচারিত গান, থাকবে না নিশিরাতে গিটারের টুংটাং শব্দ, থাকবে শুধু এই ক্যাম্পাসটা, আগের মতোই থাকবে ক্যাম্পাসেই পরে রবে অজস্র স্মৃতিবিস্মৃতি প্রকৃতি নাকি শূন্যস্থান পছন্দ করে না

আজ ২০১৭ সালে আমি ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাচ্ছি আমার এই শূণ্য জায়গাটা হয়তো পূর্ণ করবে অন্যকোনো আগন্তুক ফ্রেসার ছাত্র হয়তো ক্যাম্পাসটা আমার মতো তাকেও মায়ায় জড়িয়ে রাখবে সেই ছেলেটিও ক্যাম্পাসের ভালবাসায় পতিত হবে নিজের অজান্তেই সহস্রবার এই বিদায় বেলায় হৃদয়ের গহীনে থেকে একটা অনুচ্চারিত শব্দ বারবার ভেসে আসছে "আমি আবার আসবো ফিরে এই ক্যাম্পাসে, হয়তো ছাত্র হিশেবে নয়, প্রাক্তন ছাত্রের বেশে " ততোদিন ভালো থেকো ক্যাম্পাস, ভালো থেকো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আমার যাবার সময় হয়েছে, আমি চলে যাচ্ছি

বিদায় ক্যাম্পাস বিদায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।।

 

  লেখক : শামসুজ্জোহা বিপ্লব

  শিক্ষার্থী, রসায়ন বিভাগ

  চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।