সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮, ১০ বৈশাখ ১৪২৫
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

ব্যস্ততা থাকতেই পারে সঙ্গীকে সময় দিন

তানজিনা হোসেন | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2017-03-29 12:31:32

‘ধনীগৃহে চারুলতার কোনো কর্ম ছিল না।’ আবার ‘কাগজের আবরণ ভেদ করিয়া স্বামীকে অধিকার করা তাহার পক্ষেÿদুরূহ হইয়াছিল।’ আর এ রকম এক পরিস্থিতিতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নষ্টনীড়’ গল্পে চারু-ভূপতির জীবনে অমলের প্রবেশ। ‘ভূপতি চারুলতার প্রতি কোনো দাবি করিত না, কিন্তু সামান্য একটু পড়াইয়া পিসতুতো ভাই অমলের দাবির অন্ত ছিল না।’

চারু ও অমলের এই বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতাকে বরং চারুর স্বামী ভূপতি উদার দৃষ্টিতেই দেখত, ‘অমল, আমাকে এই কাগজের হাঙ্গামে থাকতে হয়, চারু বেচারা বড়ো একলা পড়েছে। তুমি অমল, ওকে একটু পড়াশুনোয় নিযুক্ত রাখতে পারলে ভালো হয়। মাঝে মাঝে চারুকে যদি ইংরাজি কাব্য থেকে তর্জমা করে শোনাও তা হলে ওর উপকারও হয়, ভালোও লাগে।’
তারপর কী হয়েছিল, তা বাঙালি পাঠকমাত্রই জানেন। গল্পের শেষে ভূপতির উপলব্ধি, ‘যে স্ত্রী হৃদয়ের মধ্যে নিয়ত অন্যকে ধ্যান করিতেছে, বিদেশে গিয়াও তাহাকে ভুলিতে সময় পাইব না। যাহার অন্তরের মধ্যে মৃতভার, তাহাকে বক্ষের কাছে ধরিয়া রাখা, সে আমি কতদিন পারিব? যে আশ্রয় চূর্ণ হইয়া ভাঙিয়া গেছে তাহার ভাঙা ইটকাঠগুলা ফেলিয়া যাইতে পারিব না, কাঁধে করিয়া বহিয়া বেড়াইতে হইবে?’

দুই
‘নষ্টনীড়’ গল্পে চারুলতা-ভূপতি-অমল—সবাই নির্মম ভবিতব্যের শিকার। এখানে পাঠকহৃদয় সবার প্রতিই আর্দ্র হয়ে ওঠে, কাউকে দোষী করে না। তবে কি স্ত্রীর প্রতি ভূপতির অগাধ বিশ্বাস, দাম্পত্য সম্পর্কে বিশাল উদারতাই কাল হয়ে উঠেছিল? আজকের দিনে এই কাহিনি লেখা হলে কীভাবে লেখা হতো? বোধ করি তা অনেকটা হতো রিমন-শম্পা (ছদ্মনাম) দম্পতির গল্পের মতো। নিজেদের পছন্দেই বিয়ে হয়েছিল তাঁদের। রিমন বিমান প্রকৌশলী, শম্পা বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করেন। দুজনই ক্যারিয়ার গড়তে ব্যস্ত। রিমন প্রায়ই ফ্লাইটে থাকেন, শম্পা তখন থাকেন একা। আবার রিমন যখন বাড়িতে ঘুমে, তখন হয়তো শম্পা রাত আটটা অবধি অফিস করে ফিরেই ফেসবুকে বসেছেন। কিন্তু আজকালকার দিনে দুজনের এই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত থাকাটাকে কেউ মন্দ দৃষ্টিতে দেখবেন না। পরস্পরকে সন্দেহ করারও কিন্দুমাত্র কারণ নেই। একদিন শম্পার বন্ধুরা বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে এসে সন্দিগ্ধ হয়ে প্রশ্ন করেন, ‘কী রে? আজকাল রিমন ভাইয়ের একটু বেশি ঘন ঘন ফ্লাইট পড়ে নাকি?’ শম্পা হেসে উড়িয়ে দেন, ‘ওদের এয়ারলাইনসে লোকের অভাব আছে, তাই তো বলে! দেখিস না, আমাদেরও অফিসে তিনজনের কাজ একজনকে দিয়ে করিয়ে নেয়! এমপ্লয়াররা এমনই।’
কিন্তু বিয়ের সাড়ে তিন বছর পর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। রিমনেরই এক সহকর্মী একদিন শম্পাকে জানান, রিমন একজন স্টুয়ার্ডসের সঙ্গে প্রায়ই রাত যাপন করেন। ভদ্রমহিলার নামে মোহাম্মদপুরে একটা ফ্ল্যাটও কেনা হয়েছে। মাসের বেশ কটি দিন রিমন ওখানে কাটান। রিমনকে খোলাখুলি জিজ্ঞেস করতেই তিনি স্বীকার করে নিলেন সবকিছু। রিমনকে ছেড়ে বাবার বাড়ি ফিরে আসার পর শম্পার উপলব্ধি এখন কেমন? স্বামীকে প্রশ্নাতীতভাবে বিশ্বাস করাটাই তবে কি ভুল ছিল?
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা দাঁড়িয়েই আছে বিশ্বাস আর আস্থার মজবুত ভিত্তির ওপর। ভালোবাসা, প্রেম, পারস্পরিক নির্ভরতা—সবকিছু মিলেমিশে আছে এই ভিত্তিটার সঙ্গে। তাই আমরা বলি, পরস্পরের প্রতি কখনো বিশ্বাস হারাবেন না। অবিশ্বাসের পোকা একবার সম্পর্কে প্রবেশ করলে গোটা সম্পর্ককেই ঘুণের মত খেয়ে ফেলবে। কিন্তু তাই বলে বিশ্বাসের সুযোগ নেওয়াও ঠিক নয়। অপর পক্ষ আপনার প্রতি যে অগাধ আস্থা স্থাপন করেছে, তার অমর্যাদা করাটা অনুচিত। এ জন্য আসলে চাই সম্পর্কের স্বচ্ছতাও। চাই সব সময় চলমান যোগাযোগ। ব্যস্ততা থাকবেই, থাকবে যার যার আপন জগৎ, আপন চারণক্ষেত্র; কিন্তু তা যেন গোপনীয় না হয়। লুকানোর প্রয়োজনীয়তা যেন না থাকে। হ্যাঁ, প্রাইভেসির চর্চা থাকা উচিত, তাই বলে এমনটা যেন না হয় যে দুজন আলাদা দুটি জগতে বাস করছেন, যেখানে অপর পক্ষের কোনো প্রবেশাধিকারও নেই!

এ সম্পর্কে রিলেশন এক্সপার্টরা বেশ কিছু পরামর্শ দিয়ে থাকেন। প্রথম কথা হলো যথেষ্ট কোয়ালিটি সময় দেওয়া। কাজকর্মে ব্যস্ত থাকতেই পারেন, কিন্তু তাই বলে দূরত্ব যেন তৈরি না হয়। দিন শেষে বাড়ি ফিরে একজন টিভি সিরিয়ালে তো অন্যজন ফেসবুকে মনোনিবেশ করবেন না। পরস্পরকে সময় দিন। দেখা যায় চাকরিজীবী স্ত্রী ঘরে ফিরেই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সংসারের কাজে, রান্নাবান্নায়; ওদিকে স্বামী খেলা দেখছেন বা কাগজ পড়ছেন। এর চাইতে দুজনে মিলে গল্প করতে করতে কাজগুলো সেরে ফেললে কেমন হয়? স্ত্রী চুলায় রান্না চড়াচ্ছেন, আপনিও না হয় রান্নাঘরেই টুকিটাকি সাহায্য করতে করতে সময় দিলেন। তারপর দুজনে মিলেই একসঙ্গে খবরের কাগজের সংবাদ নিয়ে কথাবার্ত বললেন বা একসঙ্গে একটা অনুষ্ঠান দেখলেন। কিংবা একটু ছাদে জগিং করে এলেন। দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতাকে ফিকে হতে দেবেন না কিছুতেই।
দ্বিতীয়ত, সবকিছুতে একটা সুন্দর বোঝাপড়া তৈরি হওয়ার মতো পরিবেশ গড়ে নিন। কাজের বা নিজেদের বন্ধুতার অনেক কিছুই পরস্পরের সঙ্গে শেয়ার করুন। পরস্পরের বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করুন, মেলামেশা বাড়ান। এটা ঠিক, এমন অনেক কিছুই থাকতে পারে, যা আপনার প্রাণের বন্ধুর সঙ্গে শেয়ার করেন অথচ জীবনসঙ্গীর সঙ্গে নয়। কিন্তু এর সংখ্যা তো অল্প। সংসারজীবনের বাইরে নিজেদের জীবনের প্রায় সবকিছুই, সব সমস্যা নিয়েই খোলাখুলি আলাপ-আলোচনা করার অভ্যাসটা টিকিয়ে রাখবেন।
তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সম্পর্ক নিয়ে দায়িত্বশীল হওয়া। যেকোনো সম্পর্কেরই কেবল দাম্পত্য নয়, দায়দায়িত্ব আছে। দায়িত্বহীনের মতো কাজ করবেন না। হুট করে, ঝোঁকের মাথায় সিদ্ধান্ত নেবেন না। একটি সম্পর্ক অনেক খুঁটিনাটি, অনেক ছোটখাটো জিনিসের ওপর গড়ে উঠতে থাকে। এর সবটাই গুরুত্বপূর্ণ। জীবনটা তাসের ঘর নয় যে এক ফুৎকারে সব গুঁড়িয়ে দেবেন। এমনকি যেকোনো স্খলন, যেকোনো অপরাধ নিয়েও আলোচনা করা যায়। প্রায়শ্চিত্ত করা সম্ভব। ভুল স্বীকার করে নিয়ে ভুল শোধরানো সম্ভব। সম্ভাব্যতার কোনো দিকই বন্ধ করে দেবেন না। ‘নষ্টনীড়’ গল্পের শেষে আবারও আমরা ভূপতিকে মৈশুরে চলে যাওয়ার বেলায় শেষ বাক্যটি বলতে শুনি, ‘চলো, চারু, আমার সঙ্গেই চলো।’ (প্রথম আলো)

 

 

 

ঢাকা/ এইচ আর