বুধবার, ২০ জুন ২০১৮, ৫ আষাঢ় ১৪২৫
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

ভালবাসার শেষ চিঠির অপেক্ষা, অতঃপর অমর প্রস্থান...!

শামসুজ্জোহা বিপ্লব | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2017-04-23 15:44:08

১। আমি আকাশ হবার পর পোস্টঅফিসের সেই চিরচেনা ডাকপিয়ন তোমার দরজায় চিঠি হাতে সাইকেল নিয়ে আর কখনো বেল বাজাতে আসে নি। অহনা! বলে ডাক দিয়ে আর বলে নি, এই তোর চিঠি এসেছে। স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে যে নিয়মিত তোমার দরজায় পৌছে দিতো আমার ভালবাসার চিঠি। আর তুমি অধীর আগ্রহে বসে থাকতে সপ্তাহে একটি ভালবাসার চিঠির প্রত্যাশায়।

আমার লেখা শেষ চিঠিটার জন্য তুমি অপেক্ষায় থাকতে পারো নি। আমি কিভাবে যেনো বুঝতে পেরেছিলাম, ভালবাসার শেষ চিঠিটা তোমার হাতে কখনো পৌছাবে না। ভালবাসার ডাকপিয়ন আমার জন্য প্রায়ই তোমার চিঠি নিয়ে আসতো। চিঠিতে লেগে থাকতো তোমার হাসি, বাঁকা বাঁকা লেখা, চোখের কাজল, বোকা বোকা ভাব, ভালবাসার জড়ানো হাজারো আবেগজড়িত কথামালার ফুলঝুরি। তুমি কবে আসবে? কতদিন দেখি না তোমায়? কবে তোমার লেখাপড়া শেষ হবে? লিখে পাঠাতে তোমার ভালবাসার গানের কথাগুলি, কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা সে চিঠি আমি গুঁজে রাখতাম আমার বুক পকেটে। তোমার চিঠির উত্তরে প্রায়ই লিখতাম, এইতো আমি চলে আসবে! আর কটা দিন মাত্র। আমিতো তোমার-ই আছি, একজীবনে শুধু তোমাকেই ভালবাসি। ভালবাসাময় জীবনের তিনটি বছরে শেষ চিঠিতে তোমাকে যতোটা কাঁদতে দেখেছি। আর কোনোদিন তোমাকে এতোটা কাঁদতে দেখি নি। চিঠির ভাষাগুলো পড়তে পড়তে আমার চোখে বেঁয়ে অঝরে চোখের জল গড়িয়ে পড়েছিলো। আমি বারবার ভাবছিলাম, আমার এখন কী করার আছে? কিভাবে পাবো তোমায়? তোমাকে এভাবে হঠাৎ এতোদুর হারিয়ে ফেলবো, আমি কখনো ভাবতেও পারি নি। আমি তো আসছিলাম তোমার কাছেই। তোমার আমার জীবনের জীবনের ছোটছোট স্বপ্নগুলো পূরনের প্রত্যাশায়, আমি একটু দুরে চলে এসেছিলাম। এইতো আমার সবকিছু প্রায় শেষের দিকে ছিলো। ফিরবো ফিরবো বলে একটু দেরি হয়ে যাচ্ছিলো। আর একটু দেরি করতে পারতে, তুমি।

২।
অহনা তুমি ভাবতে পারো। তোমার চিঠির কথাগুলো আজও আমি শুনতে পাই। প্রিয়তম রৌদ্দুর, হৃদয়ের গভীর ভালবাসা নিও। জানি না তুমি কেমন আছো? তোমাকে ছাড়া আমি ভালো নেই। গতসপ্তাহে তোমার কোনো চিঠি আমার কাছে আসে নি। এরকম তো কোনোদিন হয় নি। তোমাকে কী করে বোঝাবো? আমার ভালবাসার স্বপ্নগুলো আজ একএক করে ভেঙ্গে পড়ছে। তোমাকে চিঠি লেখার মতো আর কোনো সুযোগ আমার কাছে নেই। বোবো কান্নায় দু'চোখ ভেসে যাচ্ছে। দিন কাটছে না অপেক্ষায়। ভাবছি এই বুঝি তুমি ফিরে এসেছো কিন্তু সে শুধু আমার শুধুই কল্পনা, আমার স্বপ্ন। চিঠিতে তোমাকে কতবার আসতে বলেছিলাম। তুমি আসো নি, তুমি আমার কথা বুঝতে পারো নি। আমার আজ কী করার আছে, তুমি বলতে পারো। তোমার হাতে যখন এই চিঠি পৌছাবে, তখন হয়তো আমি আর তোমার নেই। আমি কী করে মেনে নিবো এসব? কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। আজ আমার গায়ে হলুদ, দুদিন পর আমার বিবাহ। এক বন্ধুকে দ্বারা চিঠিটা পাঠালাম। আমি ঠিক জানি না। এই চিঠি তোমার হাতে পৌছাবে কি না? চিঠিটা যদি হাতে পাও। তাহলে তুমি দেরী না করে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব গাড়িতে উঠে পড়ো। আর হয়তো তোমাকে কখনো চিঠি লিখতে পারবো না। তুমি আমাকে ছাড়া ভাল থাকবে কি করে? আমি জানি না। জানো খুব ইচ্ছে ছিলো আমাদের দু'জনের ছোটছোট স্বপ্নগুলো পূরণ করার। তা আর মনেহয় হলো না। তোমার ভালবাসা ছাড়া বাঁচবো কি করে? আমি জানি না। এ জীবনে তোমার হতে পারলাম না। আমাকে ক্ষমা করে দিও। মনেরেখো আমি তোমার-ই ছিলাম। আজীবন তোমার-ই থাকবো।। (চিঠির কিয়দংশ অপ্রকাশিত) ইতি তোমার ভালবাসা অহনা।।

৩।
তোমার ভালবাসার শেষ চিঠিটা যখন হাতে পেলাম তখন ছিলো বিকেলবেলা। কিছুক্ষন আগেই ডাকপিয়ন এসে চিঠিটা হাতে দিয়ে গেলেন। চিঠির খামটা হাতে নিতেই বুকটা কেমন জানি আচমকা কেঁপে উঠছিলো। ডাকপিয়নকে বিদায় জানিয়ে রুমে এসে চিঠিটা খুলতেই দেখলাম কান্নামাখা তোমার এ চিঠি। চিঠিটা পড়তে পড়তেই বোবা কান্নায় আমার বুকটা ভেঙ্গে যাচ্ছিলো। চিঠিটা আমার হাতে পৌছার তিনদিন আগেই তোমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো। আমার তখন কী করা উচিত? কিছুই ভেবে পাচ্ছিলাম না। তোমাকে হারিয়ে ফেলার কষ্টে বেদনায় পৃথিবীর সব কষ্ট এসে আমার বুকের উপর ভর করেছিলো। কান্নায় ভেসে যাচ্ছিলো আমার দু'চোখ। বিকেল হতে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা হতে গভীর রাত্রি পর্যন্ত তোমার কান্নামাখা চিঠিটা শুধু দেখছিলাম। আমাকে লেখা তোমার সব চিঠিগুলো সেদিন রাতে খুব দেখতে ইচ্ছে হয়েছিলো। স্বযত্নে রাখা তোমার সব চিঠির ভাঁজ খুলে সেদিন আমি শেষবারের মতো দেখেছিলাম। তোমাকে চিঠি লেখার মতো আর কোনো ঠিকানা আমার কাছে ছিলো না। তোমাকে হারিয়ে ফেলার অভিমানে সেদিন ডাইরীর শেষ পাতাটায় গভীর রাতে আহত এক হৃদয় নিয়ে লেখেছিলাম শেষ চিঠিটা। আমি বুঝতে পেরেছিলাম এ চিঠিটা কখনো তোমার হাতে পৌছাবে না, পৌছাবার কোনো কথাও ছিলো না। তুমি বিশ্বাস করবে কি না, জানি না। চিঠির কোথাও তোমাকে আমি ফিরে আসতে বলে নি। শুধু লিখেছিলাম, " ঈশ্বর! দু'জন হৃদয়ের এতো ভালবাসা দিয়ে কেনো তুমি এভাবে কেড়ে নিলে? তাহলে কেনো এতো ভালবাসার আয়োজন ছিলো? আমরা তো শুধু দু'জন দু'জনকে ভালই বেসেছিলাম। শুধু আমাদের জীবনটাই কেনো এমন হলো? অহনা! আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না। তোমার ভালবাসা ছাড়া আমার বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। আমি আকাশ হয়ে তোমার পাশে থাকবো। আর শুধু তোমাকেই ভালবাসবো।।" আমার অমর প্রস্থানে শেষ চিঠিটা আর ডাকবাক্সে তোমার ঠিকানায় পাঠানো হয় নি। কী ভাগ্য আমার! চিঠিটা আকাশের ঠিকানায় পাঠানোর আগেই, আমি তোমার বিকেলবেলার শুভ্র আকাশ হয়ে গেলাম। এই বোকা মেয়ে, এখন তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে কি করে? বলো!!

 

 

 

 

 

 

লেখক : শামসুজ্জোহা বিপ্লব

 শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।