শুক্রবার, ২২ জুন ২০১৮, ৮ আষাঢ় ১৪২৫
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

উচ্চ আদালতের রায়ের মানঃ একটি ত্রিমুখী হতাশার গল্প

এম জসিম আলী চৌধুরী | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2017-05-08 13:50:59

ব্যক্তিগত ও সামাজিক আলাপচারিতায় অনেককেই বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের দেয়া বেশিরভাগ রায়ের মান নিয়ে হতাশা প্রকাশ করতে দেখি। আমি নিজেও অবশ্য খুব বেশী উৎফুল্ল নই।

২০০৯ সালে বাংলাদেশের সাংবিধানিক আইনের উপর একটি বই লিখতে শুরু করি। পরিকল্পনা ছিল ১৯৭২ সালের ডিএলআর থেকে শুরু করে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সাংবিধানিক আইনের যত আলোচিত মামলা আছে সব পড়ে ফেলব। ২০১০ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত টানা পৌনে দু’বছর তা-ই করেছিলাম। চার শ-র মত পূর্ণাঙ্গ রায় পড়ে শেষ করেছি। পরবর্তীতে ২০১৩-১৪ সালে মুসলিম আইনের একটি বই লিখতে গিয়ে পড়েছি আরো তিন শতাধিক রায়। ২০১২ সালের সাক্ষ্য আইনের বইটির জন্যও শতাধিক। তুলনামুলক সংবিধানের উপর কাজ করতে গিয়ে ভারতীয় ও পাকিস্তানী সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ও পড়েছি কমসে কম দু’শর মত।

গত তিন বছর ধরে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক আইনের একটি বই লিখছি। সে সুত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের প্রায় পাঁচ শতাধিক সম্পূর্ণ রায় পড়া হয়েছে। শিক্ষকতা, গবেষণা ও লেখালেখির প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত পড়া হয় সাম্প্রতিক সব রায়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক আইন পড়াতে হয় বলে আন্তর্জাতিক আদালতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উচ্চ আদালতের রায় অহরহ পড়তে হয়। আমার সীমিত জ্ঞানবুদ্ধি ও বিচারবোধ মাথায় রেখেই বলতে পারি, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র তো দুরের কথা, যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ ও সেনা শাসনে বিধ্বস্ত পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের রায়গুলোও যুক্তির গভীরতা, পাণ্ডিত্যের ধার এবং বিশ্লেষণী উৎকর্ষে আমাদের চেয়ে এগিয়ে।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাংবিধানিক মামলায় বিভিন্ন বিচারকের দেয়া রায়গুলোর যুক্তিগত পক্ষপাত (leaning of reasoning) ভালোভাবে বোঝার স্বার্থে আমাকে সংশ্লিষ্ট অনেক বিচারকের বিচারক জীবনের আগের এবং পরের পেশাগত, গোষ্ঠীগত, রাজনৈতিক এবং মতাদর্শিক অবস্থান জানতে হয়েছে। তারপর বুঝতে হয়েছে নির্দিষ্ট বিষয়ে নির্দিষ্ট অবস্থান নেয়া একজন বিচারক কোন বিবেচনায় পরবর্তীতে তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেন।

সে সময় একবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের বিচারকদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, শিক্ষাগত, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং মতাদর্শিক অতীত (background) এবং বিচারক হিসেবে তাঁদের সাফল্য-ব্যর্থতার আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে একটি বিশদ এবং চলমান গবেষণায় হাত দেব। আমার একজন শিক্ষককে আগ্রহটি জানালে তিনি সরাসরি নিষেধ করেন। তাঁর যুক্তি হচ্ছে, আদালত অবমাননা আইন এবং এ নিয়ে আমাদের বিচার বিভাগের অতি স্পর্শকাতরতা (hyper sensitivity) আমার জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। পরে ২০১৪-১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে গিয়ে দেখেছি ওখানকার ল স্কুলগুলোতে বিচারকের ব্যক্তি, পরিবার, শৈশব-কৈশোর, জীবন-যৌবন, শিক্ষা-দীক্ষা, রাজনীতি-দর্শনের গবেষণা কেবল অনুমোদিতই নয় বরং অতি আবশ্যক।

বাংলাদেশের সাংবিধানিক রায়গুলো ১৯৭২ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত অনুসরণ করায় আমার একটি বিশেষ সুবিধে হয়েছে। রায়ের মান উন্নয়ন বা অবনমনের ধারাটি আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করি। পড়তে গিয়ে দেখেছি বিচারপতি মাহবুব মোরশেদ, বিচারপতি কে এম সোবহান, কখনো কখনো বিচারপতি এফ কে এম এ মুনিম, বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী, বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ, বিচারপতি এটিএম আফজাল, বিচারপতি হাবিবুর রহমান এবং বিচারপতি মোস্তফা কামাল এর বেশ কিছু রায় গুনে-মানে অনন্য।

পরবর্তীতে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের কয়েকটি রায় (পঞ্চম সংশোধনী ও সিইসি আজিজ মামলা) আমাকে বেশ উৎসাহিত করে। আইনের (বিশেষ করে সংবিধানের) ইতিহাস আশ্রিত ব্যাখ্যার যে ধারা বিচারপতি হক চালু করেন সেটি আমাকে প্রথমে মুগ্ধ করলেও পরে দেখতে পাই ইতিহাস ব্যাখ্যার নামে অযাচিত দীর্ঘ রায় দেয়ার একটি প্রবণতা উচ্চ আদালতে প্রকট হয়ে উঠে।

আইনি বিশ্লেষণ ও যুক্তির চেয়ে সংশ্লিষ্ট বা দূরবর্তীভাবে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনার ঐতিহাসিক ধারা বর্ণণা মুখ্য হয়ে উঠে। রায়ের মানের চেয়ে রায়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা বেশি নজরে আসতে থাকে। রায়ের জুরিস্প্রুডেশিয়াল বা তাত্ত্বিক ভিত্তি (jurisprudential and theoretical basis)-র চেয়ে সংশ্লিষ্ট বিচারকের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা বেশী প্রকাশিত হতে থাকে। অথচ পেছনে ফিরে দেখতে পাই, ১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে জনপ্রশাসনে মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা সুবিধার পক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে বিচারপতি হাবিবুর রহমান এবং ১৯৮০র দশকে সামরিক শাসনের বিপক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে বিচারপতি কে এম সোবহানকে খুব বেশি রাজনৈতিক মত প্রকাশ করতে হয় নি। ১৯৯০-র শুরুর দিকে গোলাম আজমের নাগরিকত্বের মামলার সিদ্ধান্ত দিতে গিয়েও বিচারপতি হাবিবুর রহমান বা অন্য কাউকে খুব বেশী রাজনৈতিক আলাপ করতে হয় নি।

মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের প্রাতিষ্ঠানিক মহাত্ন্যকে মাথায় রেখে বর্তমানে কর্মরত বিচারকদের উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকছি। তবে একটি অভিজ্ঞতার কথা না বললেই নয়। গত বছর সাংবিধানিক আইনের ক্লাসে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত একটি মামলার রায় পর্যালোচনা করেছিলাম। পাওয়ার পয়েন্টে রায়ের প্রতিটি প্যারাগ্রাফ দেখিয়ে দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের বোঝাচ্ছিলাম কেন মামলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের যুক্তির ধার-ভার পোক্ত নয়। শিক্ষার্থীদের দেখাচ্ছিলাম এটর্নি জেনারেল অফিসের অদক্ষতা ও প্রায় গবেষণাহীন সাবমিশনের সুযোগ নিয়ে মামলার আবেদনকারীপক্ষ কিভাবে কিছু হালকা যুক্তির উপর মামলা জিতে যান। পরে মামলার আবেদনকারীর আইনজীবীকেও আমি আমার ক্লাসে হাজির করি। ছাত্রদের বলছিলাম মামলার সংখ্যালঘিষ্ঠ মত প্রকাশিত হলে আমরা নিশ্চয়ই সংখ্যাগরিষ্ঠের যুক্তির চুলচেরা ও তুলোধোনা বিশ্লেষণ দেখতে পাব।

ইতোমধ্যে আমি সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ের উপর একটি একাডেমিকে বিশ্লেষণ লিখে একটি জার্নালে জমা দেই। কদিন আগে জার্নালটির রিভিউ রিপোর্ট এসেছে এবং আমাকে আমার কাজটি কিছুটা পরিমার্জন করতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে সংখ্যালঘিষ্ঠ রায় প্রকাশিত হওয়ায় আগ্রহ নিয়ে সেটি পড়া শুরু করলাম এবং মারাত্নকভাবে হতাশ হলাম। ১৩০ পৃষ্ঠার রায়ের প্রথম ১০৫ পৃষ্ঠা পেরিয়ে যাওয়ার পরেই মামলার মূল বিচার্য বিষয়ে হাত পড়ে। ১০৫ পৃষ্ঠা জুড়ে প্রাসঙ্গিক বা অপ্রাসঙ্গিকভাবে যে সমস্ত বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে এবং মামলার সাথে নুন্যতম সম্পর্কবিহীন রাজনৈতিক বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে তা দেখে বেশ খানিকটা হতাশ বোধ করেছি।

আদালতের মহামান্য বিচারকের অবমাননা এবং উচ্চ আদালতের প্রাতিষ্ঠানিক মান মর্যাদাকে নুন্যতম আঘাত করার বিন্দুমাত্র মানসিকতা কখনই ধারণ করি না। তাছাড়া উচ্চ আদালতের রায়ের মান নিয়ে শুধু বেঞ্চের সমালোচনা করলেই চলবে না। যে রায়টি পড়ছিলাম সেটিতে আবেদনকারী আইনজীবীর যুক্তিগুলোর কিছু অংশকে আমার স্রেফ মেঠো রাজনৈতিক বক্তৃতা বলে মনে হয়েছে।

আর কিছু যুক্তিকে সাংবিধানিক নীতিমালার অতি আক্ষরিক (too much literal) অনুধাবন বলে মনে হয়েছে। বিজ্ঞ এমিকাস কিউরিদের বেশীর ভাগ যুক্তিই ছিল জনপ্রিয় ধ্যানধারণা (populist dogma) এবং ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি (individual perception) তাড়িত। সম্মানিত এমিকাস কিউরিদের প্রায় সবাই তাঁদের নিজ নিজ চেম্বারের জুনিয়রের করা ইলিমেন্টারি রিসার্চ নিয়ে আদালতে এসেছেন বলে মনে হয়েছে। এটর্নি জেনারেল অফিসের কথা তো আগেই বলেছি। তাঁদের সাবমিশনে বিন্দুমাত্র গবেষণা ও চিন্তার গভীরতা আমি দেখতে পাই নি। ভালো যুক্তি-তর্ক না হলে ভালো রায় আসবে কেন?

ন্যায়বিচার প্রশাসনের মান যে বেঞ্চ, বার ও একাডেমিয়ার ত্রিমুখী মিথস্ক্রিয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত হয় সে সত্যটিকে আমরা বেপরোয়াভাবে উপেক্ষা করে চলেছি। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মাত্রাতিরিক্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, এটর্নি জেনারেল, পিপি, জিপি সহ সব ধরনের সরকারী কৌশলী নিয়োগে লাগামছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনাকে দোষারোপ করা যেতেই পারে। কিন্তু আইন পেশায় নিয়োজিত অগ্রগণ্য সিনিয়র আইনজীবীরা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমরা শিক্ষকরাই বা কি এমন গবেষণা ধর্মী (research oriented) ও সমালোচনা প্রবণ (critical) আইন শিক্ষা দিচ্ছি?

 

 

লেখক: এম জসিম আলী চৌধুরী
আইন বিভাগ

সহকারী অধ্যাপক
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়