বুধবার, ২০ জুন ২০১৮, ৫ আষাঢ় ১৪২৫
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

হারিয়ে যাওয়া ২২ ধনী পরিবার

ডেস্ক রিপোর্ট | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2017-05-08 14:31:09

১৯৭০ সালের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানে ২২টি কোটিপতি বণিক পরিবারের কথা বলা হতো। তাদের মধ্যে দুটি পরিবার ছিল পূর্ব পাকিস্তানে তথা বাংলাদেশে। একটি হলো এ কে খান পরিবার। অন্যটি ইস্পাহানি (অবাঙালি) পরিবার। এর বাইরে আরও অর্ধশতাধিক জমিদার পরিবার ছিল।

স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে বাংলাদেশে এসব পরিবারের প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকলেও বর্তমান সময়ে যেন হারিয়ে যেতে বসেছেন তারা!

অন্যদিকে শীর্ষ ধনীর তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নাম। বর্তমানে বাংলাদেশের বিজনেস মোগল নামে পরিচিত মুসা বিন শমসের। যিনি ড্যাটকো গ্রুপের চেয়ারম্যান। ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে তিনিই বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। মুসা বিন শমসেরের মোট অর্থের পরিমাণ ১০০ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা)

এছাড়া ধনী হিসেবে আলাদা পরিচিতি পেয়েছেন বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সালমান এফ রহমান। বেইজিংয়ের গবেষণা প্রতিষ্ঠান হুরুন গ্লোবালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় তার অবস্থান হাজার ৬৮৫তম স্থানে। তালিকাটিতে মোট হাজার ২৫৭ জনের নাম রয়েছে। বাংলাদেশের কোনও ব্যবসায়ী এবারই প্রথম আন্তর্জাতিকভাবে ধনীর তালিকায় উঠে এলেন। এতে তার সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১৩০ কোটি ডলার

ধনীদের তালিকায় আরও আছেন বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ আকবর সোবহান, পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এম হাশেম, গাজী গ্রুপের গোলাম দস্তগীর গাজী, যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম, ইস্ট-কোস্ট গ্রুপের মালিক আজম জে চৌধুরী, নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, এস আলম গ্রুপের সাইফুল ইসলামসহ শতাধিক ব্যক্তি। বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বেসরকারি হাসপাতাল, টিভি চ্যানেল, ব্যাংক বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক তারা

এর বাইরেও নতুন নতুন শিল্পোদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে কোটি টাকা বা এর বেশি টাকার সম্পদের মালিক এখন ১৭ হাজার ৩৯ জন। এনবিআর-এর তৈরি করা ২০১৫-১৬ করবর্ষের শীর্ষ ১০ করদাতার তালিকায় নাম রয়েছে হাকিমপুরী জর্দা বিক্রেতা কাউছ মিয়ার

এছাড়া এই করবর্ষে শীর্ষ করদাতার মধ্যে জনই একই পরিবারের। তারা সবাই ওষুধের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এই পরিবার ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের স্বত্ত্বাধিকারী। সেরা করদাতার তালিকার দ্বিতীয় থেকে সপ্তম স্থান দখল করে আছেন পরিবারটির সদস্যরা। তারা হলেন মিসেস খাজা তাজমহল, মিসেস রুবাইয়াৎ ফারজানা হোসেন, মিসেস লায়লা হোসেনমিসেস হোসনে আরা হোসেন, এম হায়দার হোসেন মোহাম্মদ ইউসুফ

সেরা করদাতার তালিকায় অষ্টম স্থানে আছেন সার ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত কামরুল আশরাফ খান। নবম সেরা করদাতা হলেন গাজী গ্রুপের পরিচালক গোলাম দস্তগীর গাজী। দশম স্থানে রয়েছেন ওষুধ শিল্পের স্থপতি ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের মালিক আবদুল মুক্তাদির

২০১৬ সালের নভেম্বরে এনবিআর প্রথমবারের মতো শীর্ষ ১০০ করদাতার তালিকা প্রকাশ করে। ২০১৫-১৬ করবর্ষে দেওয়া করের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে এটি তৈরি করা হয়। শীর্ষ ১০০ করদাতার তালিকায় ওপরের দিকে রয়েছেন স্কয়ার গ্রুপের উদ্যোক্তারা, যাদের মধ্যে আছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী প্রয়াত স্যামসন এইচ চৌধুরীর তিন ছেলে স্যামুয়েল এস চৌধুরী, তপন চৌধুরী, অঞ্জন চৌধুরী মেয়ে রত্নাপাত্র। এই ভাইবোনেরা তালিকার ১৫ থেকে ২৬ নম্বরের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন

২২ নম্বরে আছেন ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান। তালিকায় তার ঠিক পরেই রয়েছেন হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান কে আজাদ। প্রথম ৫০ জনের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন চট্টগ্রামের বনেদি ব্যবসায়ী কে খানের ছেলে সদরুদ্দীন খান, দ্য একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান সিনহা, ইসলাম গ্রুপের চেয়ারম্যান মনজুরুল ইসলাম, আরএকে সিরামিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে একরামুজ্জামান নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। শীর্ষ করদাতার ৫০তম স্থানে রয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী মুস্তফা কামাল। তিনি লোটাস কামাল গ্রুপের উদ্যোক্তা

করদাতা তালিকার ৫১ থেকে ১০০তম স্থান পর্যন্ত যারা আছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম এসিআই লিমিটেডের চেয়ারম্যান আনিস উদ দৌলা, কে খান গ্রুপের সালাহউদ্দিন কাশেম খান, কে শামসুদ্দীন খান জিয়া উদ্দিন খান, ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক শাহনাজ রহমান, দ্য একমি ল্যাবরেটরিজের চেয়ারম্যান আফজালুর রহমান সিনহা, চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, নিটল নিলয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদের ছেলে আবদুল মুসাব্বির আহমাদ, গাজী গ্রুপের পরিচালক গাজী গোলাম মুর্তজা

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ করবর্ষের শীর্ষ তালিকায় নাম না থাকলেও ২০১৪-১৫ করবর্ষে ব্যক্তিপর্যায়ে বেশি আয়কর দিয়েছিলেন নাসা গ্রুপ এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। ওই বছরে তিনি ১৯০ কোটি ২৬ লাখ ৪২ হাজার টাকা আয়ের বিপরীতে কর পরিশোধ করেন ১০ কোটি ৭৩ লাখ ২৭ হাজার টাকা। প্রসঙ্গে নজরুল ইসলাম মজুমদার  বলেন, ‘ব্যবসায় বিনিয়োগ করে যে আয় হয়েছে তার ওপর যথাযথ কর দিয়েছি। দেশকে সবচেয়ে বেশি দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তবে ব্যবসায়ীরা যেন স্বতস্ফূর্তভাবে আয়কর দিতে উৎসাহিত হয়, সেজন্য তাদের বিশেষ ছাড় দেওয়া দরকার।

২০১৪-১৫ করবর্ষে শীর্ষ করদাতাদের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন গাজী গ্রুপের স্বত্ত্বাধিকারী গোলাম দস্তগীর গাজী। তিনি ওই বছর পরিশোধ করেন ১০ কোটি ৪৫ লাখ ১২ হাজার টাকা। তার আয় দেখানো হয় ২৭ কোটি ৯৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। ওই বছর তৃতীয় শীর্ষ করদাতা হন বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ আকবর সোবহানের স্ত্রী আফরোজা বেগম। তিনি কর পরিশোধ করেন কোটি লাখ ৭২ হাজার টাকা। চতুর্থ অবস্থানে থাকা তার ছেলে সাদাত সোবহান কর পরিশোধ করেছিলেন কোটি ৯৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা

তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে থাকা ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান ২০১৪-১৫ করবর্ষে পরিশোধ করেন কোটি ৮৫ লাখ ৩১ হাজার টাকা। শীর্ষ করদাতাদের তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী মুস্তফা কামাল। তিনি কোটি ৮৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা আয়ের বিপরীতে কর দেন কোটি ৩২ লাখ হাজার টাকা। সপ্তম অবস্থানে থাকা ইস্টার্ন হাউজিংয়ের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল ইসলাম ওই বছর কর দিয়েছেন কোটি লাখ ১০ হাজার টাকা

অষ্টম অবস্থানে আছেন ইউনিক গ্রুপের চেয়ারম্যান সেলিনা আলী। তিনি ওই বছর কর পরিশোধ করেন কোটি ৮৮ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। নবম স্থানে থাকা ট্রান্সকম গ্রুপের আরেক সদস্য সাইফুর রহমান কর দিয়েছেন কোটি ৮০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। দশম স্থানে থাকা সিনহা গ্রুপের স্বত্ত্বাধিকারী আনিসুর রহমান সিনহা কর দেন কোটি ৪৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। 

অন্যদিকে সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে স্বাধীনতার আগে ভারতীয় উপ-মহাদেশে রাজত্ব করা ইস্পাহানি পরিবার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই প্রতিষ্ঠানটিকে পেছনে ফেলে একে একে  উঠে এসেছে অন্যরা। অবশ্য ১৯৮৮ সালে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয়টি ছিল ইস্পাহানি। এমএম (সদরী) ইস্পাহানি প্রতিষ্ঠিত গ্রুপটির অধীনে ওই সময় কোম্পানি ছিল মোট ২৩টি। তবে নানান সমস্যা কাটিয়ে উঠতে তখন তারা কর্মচারীর সংখ্যা কমালে ২০ হাজার থেকে তা নেমে আসে ১২ হাজারে

অবশ্য পেছনের ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেছে, ১৯৬৯-৭০ মেয়াদে শীর্ষ ১০ বাংলাদেশি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা পরিবারের মধ্যে প্রথমেই ছিল কে খান পরিবার। এই পরিবারের তখন ১২টি প্রতিষ্ঠান ছিল। সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক সাড়ে কোটি রুপি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা পরিবারটির নাম গুলবক্স ভূঁইয়া। ওই সময় এই পরিবারের প্রতিষ্ঠান ছিল পাঁচটি এবং সম্পদের পরিমাণ সাড়ে কোটি রুপি। তৃতীয় স্থানে থাকা জহুরুল ইসলাম ভাইদের সম্পদের পরিমাণ ছিল কোটি রুপি, তাদের প্রতিষ্ঠান ছিল ১৪টি

স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে চতুর্থ স্থানে ছিলেন মো. ফকির চাঁদ। তখন পরিবারের ৯টি প্রতিষ্ঠান ছিল। তাদেরও সম্পদ ছিল কোটি রুপি। পঞ্চম স্থানে ছিলেন মকবুল রহমান জহিরুল কাইউম। পরিবারটির তখন ৬টি প্রতিষ্ঠান কোটি রুপির সম্পদ ছিল। ষষ্ঠ স্থানে থাকা আলহাজ মুসলিমউদ্দিনের পরিবারেরও ৬টি প্রতিষ্ঠান কোটি রুপির সম্পদ ছিল। সপ্তম স্থানে ছিলেন আলহাজ শামসুজ্জোহা। এই পরিবারের তখন ছিল ৪টি প্রতিষ্ঠান কোটি রুপির সম্পদ। অষ্টম স্থানে ছিলেন খান বাহাদুর মুজিবর রহমান। ওই সময় তার পরিবারের ৫টি প্রতিষ্ঠান সাড়ে কোটি রুপির সম্পদ ছিল। নবম স্থানে থাকা আফিলউদ্দিন আহমেদ পরিবারের ৪টি প্রতিষ্ঠান আর কোটি রুপির সম্পদ ছিল। দশম স্থানে ছিলেন এমএ সাত্তার। এই পরিবারের তখন ৫টি প্রতিষ্ঠান আর তাদের সম্পদ ছিল কোটি রুপি

১৯৬৯-৭০ মেয়াদে শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হিসাব করা হয়েছে আনুমানিক সম্পত্তির ভিত্তিতে। এছাড়া মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স প্রকাশিত মেম্বার ডিরেক্টরির তথ্য বিশ্লেষণ করে সাজানো হয়েছে ১৯৮৮ সালের শীর্ষস্থানীয় শিল্প বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর তালিকা। ২০১৩-১৪ করবর্ষের ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের নিট সম্পদের ভিত্তিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য নিয়ে করা হয়েছে সর্বশেষ তালিকা

এর বাইরে বনেদি পরিবারের অন্যতম ছিলেন চট্টগ্রামের রাউজানের তৎকালীন অবিভক্ত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট কে এম ফজলুল কাদের চৌধুরী আনোয়ারা উপজেলার আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর পরিবার। তার বাবা ছিলেন জমিদার নুরুজ্জামান চৌধুরী। এছাড়া বনেদি পরিবারের অন্যতম ছিল নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবার।

এর বাইরে এই অঞ্চলের বিপুল টাকা-পয়সার মালিক ছিল তেওতা জমিদার পরিবার। দেশগুপ্ত পরিবারের পঞ্চানন চৌধুরী (জন্ম ১৭৪০) এই তেওতা জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি জন্মেছিলেন মানিকগঞ্জ জেলায়। তেওতা জমিদারির আওতাভুক্ত ছিল ঢাকা, ফরিদপুর, পাবনা এবং দিনাজপুরসহ রংপুর বর্ধমানের কিছু অংশ নিয়ে বিস্তৃত অঞ্চল। ১৯১৪ সালে এই পরিবারের শুধু দিনাজপুরের সম্পত্তির মূল্য ছিল ১১ লাখ টাকারও বেশি। তখন এই পরিবার সরকারের রাজস্ব খাতে ৬০ হাজারেরও বেশি টাকা কর দিতো

বাংলাদেশের এই ভূখণ্ডে একসময় প্রভাব বিস্তার করেছিল মুঘল আমলে প্রতিষ্ঠিত ফরিদপুরের জমিদার পরিবার। প্রভাব বিস্তার করা আরেক জমিদার পরিবার হলো কীর্তিপাশা জমিদার পরিবার। তারা ঝালকাঠি জেলার বৈদ্য বংশীয় জমিদার। এর বাইরে বরিশাল জেলায় ছিল সুপ্রাচীন মাধবপাশা জমিদার পরিবার। বর্তমানে জমিদার পরিবারগুলো অবস্থা বেশ নাজুক। তাদের জমিদারির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অধিকাংশই এখন বেদখল

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার বকুল কিশোর আচার্য চৌধুরীর (ডাবল এমএ) পরিবারটির সংসার চলছে সুপারি নারিকেল বিক্রি করে। এই পরিবারের সদস্য শ্রিপ্রা আচার্য চৌধুরী  জানানময়মনসিংহের ভালুকা, গফরগাঁও, গাজীপুর, জয়দেবপুর, বগুড়া, বরিশাল, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন স্থানে এখনও তাদের ভূ-সম্পত্তি রয়েছে। তবে সেগুলো এখন তাদের হাতছাড়া

একইভাবে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম ধনাঢ্য আদমজী পরিবারের তিন ভাই ওয়াহেদ আদমজী ওরফে দাউদ আদমজী, জাকারিয়া আদমজী এবং গুল মোহাম্মদও এখন ইতিহাস। আদমজী পরিবার যৌথভাবে ১৯৫০ সালে সিদ্ধিরগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে ২৯৪ দশমিক ৮৮ একর জমিতে গড়ে তোলে আদমজী জুট মিলস। কিন্তু ২০০২ সালে এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজী জুট মিলস বন্ধ করে দেওয়া হয়

প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ  জানান, পাকিস্তান আমলে ২২টি ধনী পরিবার থাকলেও বাঙালি কোনও ধনী পরিবার ছিল না বললেই চলে। স্বাধীনতার পর থেকে ধনীরা দেশ থেকে চলে যাওয়া শুরু করে। তাদের মধ্যে অন্যতম আদমজী গ্রুপ। এছাড়া অনেকেই চলে গেছে স্বাধীনতার পর। ইস্পাহানি সম্পূর্ণ যায়নি, তবে তাদের ব্যবসাও বাড়েনি। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের এখনকার ধনীরা সেই ২২ পরিবারকেও ছাড়িয়ে গেছেন। এখন কয়েকশ ধনী পরিবারের বসবাস দেশে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে কিংবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েও অনেকে ধনী হয়েছেন। কারণে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্যও বেড়েছে।

প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর . সালেহউদ্দিন আহমেদ  বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছে ধনী পরিবারগুলো। স্বাধীনতার পর তারা ব্যবসা গুটিয়ে পাকিস্তানে চলে গেছেন। স্বাধীনতার পর দেশের অনেকেই সেইসব ব্যবসার হাল ধরেছেন। ওই সময় অনেকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও পেয়েছেন। এছাড়া অনেকে নতুন ব্যবসা শুরু করেন। এরপর থেকে তাদের ব্যবসা বড় হয়েছে।

. সালেহউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি যেভাবে বড় হয়েছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনেকেই প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন করে সফলতা দেখিয়েছেন। পাকিস্তানের বড় ব্যবসায়ী ধনীরা মূলত চা এবং পাটের ব্যবসায় বিনিয়োগ করতেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর ব্যবসার ধরন বদলেছে। ব্যাংক থেকে অনেকে ঋণ সুবিধাও পেয়েছেন। পাশাপাশি তাদের দক্ষতাও বেড়েছে। সব মিলিয়ে যোগ্যরাই দেশে ধনী পরিবার করতে পেরেছেন।

এদিকে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স প্রকাশিত মেম্বার ডিরেক্টরির তথ্য অনুযায়ী, আশির দশকে জহুরুল ইসলাম গ্রুপ দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। মূলত ঠিকাদার ব্যবসার মাধ্যমে গ্রুপটি প্রতিষ্ঠা করেন জহুরুল ইসলাম। ১৯৮৮ সাল নাগাদ গ্রুপের বার্ষিক টার্নওভার দাঁড়ায় ৬২৮ কোটি টাকায়। সময় গ্রুপের অধীন প্রতিষ্ঠান ছিল ২৪টি। ১৯৮৮ সালে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় নম্বরে ছিল ইস্পাহানি গ্রুপ

আশির দশকে এএসএফ রহমান প্রতিষ্ঠিত বেক্সিমকো গ্রুপ ছিল তালিকার তৃতীয় স্থানে। ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক টার্নওভার ছিল ৫২৪ কোটি টাকা। পরের স্থানে ছিল মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইনের আনোয়ার গ্রুপ। পঞ্চম স্থানে থাকা কে খান গ্রুপের টার্নওভার ছিল ৪০০ কোটি টাকা। ষষ্ঠ ধনী ব্যবসায়ী পরিবার ছিল মুহাম্মদ ভাই। সপ্তম স্থানে লতিফুর রহমানের ডব্লিউ রহমান জুট, অষ্টম স্থানে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর এপেক্স, নবম স্থানে এম মোর্শেদ খানের প্যাসিফিক এবং দশম স্থানে ছিল স্যামসন এইচ চৌধুরীর স্কয়ার গ্রুপ

অবশ্য ব্যাংকিং খাতের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতির সংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচ জন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে (১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত) সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭-এ। জিয়াউর রহমান সরকারের আমলে (ডিসেম্বর ১৯৮০) সংখ্যাটি আরও বেড়ে হয় ৯৮। বর্তমানে ব্যাংক খাতে কোটি টাকার বেশি সঞ্চয় রয়েছে এমন হিসাবধারীর সংখ্যা ৬৫ হাজার ৭৯৭ জন। দিনবদলের সঙ্গে অর্থনীতি বড় হয়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে সম্পদশালী পরিবারের সংখ্যাও। (বাংলা ট্রিবিউনের সৌজণ্যে)

 

 

 

ঢাকা/ এইচ আর