মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

ছাত্র রাজনীতির কবরস্থান ! (পর্ব-১)

আবু বকর ছিদ্দিক রাহাত | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2017-05-28 14:50:00

দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের প্রথম সারির অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মত এটি ৭৩ এ্যাক্টের একটি শিক্ষালয়। ৫০ বছর ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। বর্তমানে অর্ধশত বিভাগ ও সহস্রাধিক শিক্ষক রয়েছে। যেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় কোন অবকাঠামো ও আবাসন না থাকলেও রয়েছে পর্যাপ্ত রাজনীতি। রাজনীতির বৃক্ষ এখানে রয়েছে অন্তিম পর্যায়ে। বার্ধক্য যাকে ঘিরে রেখেছে।

ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষক রাজনীতি, কর্মকর্তা, কর্মচারী রাজনীতি। এ সবের মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের বাড়াবাড়ি। যখন যে দল ক্ষমতায় সে দলের নেতাকর্মীদের বেশী বেশী দরকার হয় এখানে। আর তা করতে অনেকটা বাধ্য থাকেন এখানকার প্রশাসন। গত ১৭ বছরের ইতিহাস তার চাক্ষুস প্রমাণ।

তার চেয়ে আশংকার যে জায়গাটি তৈরী হয়েছে সেটা হলো অযোগ্যদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ। কারো উচ্চ ফলাফলকে আমি যোগ্যতা হিসেবে দেখছি না। কারন ফলাফল কারো যোগ্যতা প্রকাশ করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় দেখেছি অপেক্ষাকৃত কম ফলাফলের শিক্ষকরাই ছাত্রদের ব্যাপারে বেশী আন্তরিক। শিক্ষা গবেষনায় তারা এগিয়ে। খুব অল্প সময়ে তারা অধ্যাপক হয়ে যাচ্ছেন। দেশে বিদেশের জার্নালগুলোতে ছাপানো হচ্ছে ওইসব শিক্ষকদের লেখা। আবার কতক শিক্ষক দেখেছি যারা কখনোই শিক্ষাজীবনে ২য় হননি। বারবরই ছিলেন এগিয়ে। তারাই বিভিন্নস্থানে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনঅফিসিয়াল ব্রান্ডিং করছেন। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হল এসব শিক্ষক এখন একেবারেই কম। ফলে ওই অযোগ্যরাই নিয়ন্ত্রন করছেন বিশ্ববিদ্যায়ের সব ধরনের রাজনীতিতে।

যাই হোক বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষকদের হালচাল নিয়ে অন্যদিন বলা যাবে, তবে আজ যে বিষয়টি বলব তা হয়তো ইতিমধ্যেই শিরোনামে দেখা হয়ে গেছে। ‘ছাত্ররাজনীতির কবরস্থান’ কথাটি শুনলে অনেকের মনে নেতিবাচক একটি প্রতিক্রিয়া তৈরী হতে পারে। কিন্তু আমার জানা শোনা একটি বিশ্লেষন তুলে ধরবে, যা শিরোনামকে স্বার্থক করে তুলবে বলে আশা করা যায়।

দেশের প্রথম সারির যে কয়েকটি ছাত্রসংগঠন রয়েছে। সবগুলোর কার্যক্রম রয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্রইউনিয়ন, ছাত্রফেডারেশন, ছাত্রফ্রন্ট ছাত্রসমাজ এবং ছাত্রশিবির। গত সাড়ে ৬ বছরে এ সংগঠনগুলোর কার্যক্রম স্বচোক্ষে দেখেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা করা ও ছাত্ররাজনীতির প্রতি একটা কিউরিসিটি সব সময় ছিল বলে আমি রাজনীতি করা ছেলেদের সাথে বেশী মিশতাম। ফলে অধিকাংশ সংগঠনগুলোর ব্যাপারে খুব কাছ থেকে দেখা হয়েছে। আর তার আলোকেই কিভাবে শিরোনামকে তোলা হয়েছে সে বিষয়টি আলোচনা করছি।

প্রথমত: ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ। দেশের জন্ম, ভাষা সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বেশী অবদান এ সংগঠনটির থাকলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ বরাবরই খবরের শিরোনাম হয়েছে মারামারি, হত্যা, টেন্ডারবাজি, সাংবাদিক লাঞ্ছনা এবং ছিনতাইয়ের খবর নিয়ে। সাড়ে ৬ বছরে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির বাইরে ২০১৩ সালে একটি শিক্ষা ও পাঠচক্র ছাড়া আর কোন কর্মসূচি চোখে পড়েনি। শিরোনাম যেহেতু হয়েছে সেহেতু ঘটনাও ঘটেছে নিশ্চই। হুম, সেটা অতি অবাক করা ব্যাপার। ২০০৮ সাল থেকে ২০১৭ সালের মে মাস পর্যন্ত মোট ছোট বড় ১৫৮ টি সংঘর্ষের ঘটনায় শিরোনাম হয়েছে সংগঠনটি। আর এ সংগঠনের কর্মীদের হাতে নিহত হয়েছেন আরো ৭ শিক্ষার্থী। যাদের মধ্যে ভিন্ন মতাবলম্বীরা রয়েছেন। শুধু তাই নয়, দেশের একটি বৃহত্তর লগ্নে যখনই দলীয় সভানেত্রীর কোন পজিটিভ বিষয় খবরের কাগজে এসেছে সেদিনই পাশে থেকেছে ছাত্রলীগের এ সংসদটির কোন নেতিবাচক কাজের ছবি ও সংবাদ। যার সবচেয়ে বড় উদাহরন ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর। এসব কারনে ক্যাম্পাসেই ‘প্রগতিশীল’ ছাত্রলীগ নেতাদের খুব তাড়াতাড়ি রাজনীতি ছেড়ে দিতে হয়েছে। ফলে রাজনীতি থেকে বিমুখ হতে দেখেছি সহস্রাধিক ছাত্রলীগের নেতাকর্মীকে। যা একটি সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। ফলে সাধারন শিক্ষার্থীরাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ।।

দ্বিতীয়ত, ছাত্রদলের কথা বলব। দেশের ২য় বৃহত্তম এ ছাত্রসংগঠনটির চবিতে কার্যক্রম শুধু ওই দিবসগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ দেখা গেলেও সম্প্রতি ছাত্রদলের নতুন কমিটি কার্যক্রমকে আদর্শিকভাবে এগিয়ে নিয়ে চেষ্টা করছেন। যদিও সেটা একেবারেই অসম্ভবের কাছাকাছি বলেই মনে হয়। কারন দীর্ঘ আয়তনের এ ক্যাম্পাসে কখনো সাধারন শিক্ষার্থীদের কাছে পৌছাঁতে পারেনি সংগঠনটির নেতারা। সংগঠনটির আভ্যন্তরিন অতি কোন্দল ও ছাত্রলীগ ছাত্রশিবির বিতর্কে পিছিয়ে রয়েছে সংগঠনটি। গত ১৫ বছরে ছাত্রদলের নেতা নুরুল হুদা মুসাকে রাজনীতির কারনের লাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে এ ক্যাম্পাস থেকে। ফলে আন্তরিক নেতাকর্মীদের সংখ্যা নিতান্তই কম। শুধু তাই নয়, আঞ্চলিক নেতাদের মাত্রাতিরক্ত বাড়াবাড়ি ধ্বংসের শেষ পর্যায়ে নিয়ে গেছে সংগঠনটিকে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কখনোই মাঠে দেখা যায়নি নেতাকর্মীদের । ফলে সাধারন শিক্ষার্থীরাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ।।

 

লেখক: আবু বকর ছিদ্দিক রাহাত

সভাপতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি।