রবিবার, ২১ জানুয়ারী ২০১৮, ৭ মাঘ ১৪২৪
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

সেকাল–একাল

রমজান মাসে ইফতার–রাজনীতি

মহিউদ্দিন আহমদ | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2017-06-10 13:05:57

তখন আমি খুবই ছোট। অনেক কিছুই বুঝতাম না। এখনো যে বুঝি, তা-ও নয়। তবে ছোটবেলার একটা ঘটনা মনে হলে এখনো হাসি পায়। তখন রোজার মাস চলছিল। রোজা রাখতে পারার মধ্যে একটা বাহাদুরির ভাব থাকত। মা-বাবা, অত অল্প বয়সে রোজা রাখতে দিতেন না। একটা শর্টকাট উপায় ছিল। বোতলে মুখ দিয়ে বাতাস ভরে ছিপি আটকে দিয়ে খাওয়াদাওয়া করতাম। তারপর ছিপি খুলে বোতল থেকে বাতাসটা মুখ দিয়ে টেনে নিতাম। এতে রোজা ভাঙত না, এই ছিল বিশ্বাস।

রোজার মধ্যে ইফতারের ব্যাপারটা ছিল মজার। ঘরে টুকটাক খাবার তৈরি হতো। মনে পড়ে, একবার বলা হলো আমরা একসঙ্গে ইফতার খাব। তো শরবত, ডালের বড়া ইত্যাদি খাওয়ার পর দেখলাম বড়রা সবাই উঠে পড়ছেন। জিজ্ঞেস করলাম, সবই তো খেলাম, ইফতার তো খেলাম না, ওটা কই? সবাই হাসাহাসি করলেন। আস্তে আস্তে বুঝলাম, ইফতার কী।
আমার যদ্দুর মনে পড়ে, ইফতার ছিল খুবই সাদামাটা। রাস্তার ধারে বরফ বিক্রি হতো। হয়তো এক সের বরফ কিনে এনে সেটা কলসির মধ্যে ঢেলে দেওয়া হতো। ঘরেই দু-এক পদ খাবার তৈরি করতেন মা। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাত খাওয়া। ‘ইফতার’ তখনো এতটা মুখ্য হয়ে ওঠেনি।
দিন বদলে গেছে। নাগরিক জীবনে বাজারি ইফতারি এখন পৌঁছে গেছে ঘরে ঘরে। পাড়ায় পাড়ায় এবং পথেঘাটে দুপুরের পর থেকেই খাবারের পসরা সাজিয়ে দোকানিরা বসে থাকেন। বিক্রেতা অগুনতি। অনেক আয়োজন, অনেক বিনিয়োগ, অনেক কর্মসংস্থান। ইফতারি এখন দেশের একটা বড় ইন্ডাস্ট্রি।
রোজার মাসজুড়েই আমাদের রসনার পালে বাতাস দেয় বাহারি সব বিজ্ঞাপন। পত্রিকার পাতায় মুখরোচক খাবারের মনকাড়া শব্দাবলি চোখে পড়ে। রেস্তোরাঁয় গিয়ে একজন খেলে আরেকজন ফ্রি। খাবারের রেসিপি নিয়ে কাগজগুলো বিশেষ পাতা বা সংখ্যা ছাপায়। সিয়াম সাধনা বা সংযমের কথা যত জোরেশোরেই বয়ান করা হোক না কেন, প্রকৃতপক্ষে দেখা যায় এটা ব্যাপক ভোগচর্চার মাস। ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। রোজার সঙ্গে খেজুর কিংবা বেগুনের কী সম্পর্ক, তা আজও বুঝে উঠতে পারলাম না। এ দুটো জিনিসের প্রতি কেন যেন এ মাসে আকর্ষণ যায় বেড়ে। এই সুযোগটা নেন ব্যবসায়ীরা। রোজা সামনে রেখে সিটি করপোরেশন মাংসের দাম ঠিক করে দেয়। রোজা রাখার সঙ্গে মাংসের কী সম্পর্ক, তা-ও আমার অজানা।
রোজা নিয়ে এবার কোনো কোনো মসজিদে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক, তারাবির নামাজ মসজিদে গিয়ে পড়তে হবে কি না, পড়লে কয় রাকাত—আট নাকি বিশ, ইত্যাদি। খবর নিয়ে জেনেছি, কোনো কোনো মসজিদে প্রথম কয়েক দিন খুব ভিড় হতো। এখন কাতারের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এ নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমার এ বিষয়ে কোনো এলেম নেই।

বেশ কয়েক বছর যাবৎ লক্ষ করছি, রাজনৈতিক দলগুলো ইফতার পার্টির নামে সমাবেশ আয়োজন করে। বলা যায় ইফতার রাজনীতি। যে দল আয়োজন করে, তারা সাধারণত তাদের সমমনাদেরই দাওয়াত দেয়। প্রতিপক্ষের কোনো কোনো দল বা নেতাকে সৌজন্যমূলক নেমতন্ন করলেও তাঁরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ওই নিমন্ত্রণ কবুল করেন না। কারণ একটাই, রাজনীতি।

রাজনৈতিক দলগুলো মাসজুড়েই ইফতার পার্টির নামে নিজেদের দৃশ্যমান রাখে। ছোট দলগুলোর আর্থিক সংগতি কম। তারা দলের অফিসে কিংবা ছোটখাটো জায়গা ভাড়া করে এক সন্ধ্যার জন্য হলেও একটা জমায়াতের চেষ্টার করেন। কিন্তু বড় দলগুলোর আয়োজন থাকে প্রায় প্রতিদিন। এরও একটা রুটিন বা ফর্মুলা আছে। শুরু হয় অনাথ শিশু-কিশোরদের ডেকে এনে তাদের সঙ্গে ইফতার করা। সঙ্গে থাকেন আলেম-ওলামা। তারপর একে একে চলে দলের নানা স্তরের লোক, জোটের সদস্য, কূটনীতিক, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কিংবা সার্টিফিকেটধারী অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আয়োজন। সুশীলরাও বাদ পড়েন না। সাংবাদিক নেতারা তো ‘ক্রস-কাটিং’ গোষ্ঠী। তাঁরা সব দাওয়াতেই যান। তাঁরা না গেলে খবর ছাপবেন বা প্রচার করবেন কারা।

রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা কিংবা পেশাজীবী গোষ্ঠীও এ মাসে একবার হলেও ইফতার পার্টির আয়োজন করে থাকে। সেখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা সব দলের কিংবা সব ধর্মের প্রতিনিধিদের দেখা পাই। এগুলো অনেকটাই সর্বজনীন ইফতার পার্টির মতো।
নাগরিকদের মধ্যে দুটো ভাগ আছে। প্রাচীন রোমে প্যাট্রিসিয়ান আর প্লিবিয়ানে সমাজটা বিভক্ত ছিল। আমাদের দেশেও আছে ‘আশরাফ’ আর ‘আতরাফ’। নাগরিক সমাজে আছেন ‘আমজনতা’ এবং ‘বিশিষ্ট নাগরিক’। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে বিশিষ্ট নাগরিকদের অনেক কদর। তাঁরা কেউ কেউ দলের জন্য কাজ করেন, দলকে নানা পরামর্শ দেন এবং অনেকেই ভাড়া খাটেন। তাঁরাও আবার দুই শিবিরে ভাগ হয়ে আছেন। একদল আওয়ামী লীগের ইফতার মজলিশে দাওয়াত পান, আরেক দল দাওয়াত পান বিএনপির মজলিশে। সেখানে রাজনীতি নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়। প্রতিযোগী কিংবা প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের প্রতি উষ্মা দেখানোর এবং কটু কথা বলার কমতি থাকে না।

এবারের ইফতার পার্টিগুলো আমি দেখছি। ভিন্ন আঙ্গিকে। আমার আন্দাজ, রাজনৈতিক দলগুলোর ইফতার পার্টিতে একধরনের মেরুকরণের আভাস পাওয়া যায় কি না, তার তত্ত্ব-তালাশ করা। কোন ছোট দলের নেতা কোন বড় দলের পার্টিতে শরবত-বেগুনি-বিরিয়ানি খেতে গেলেন, তা নিয়ে ভবিষ্যতের একটা পারমুটেশন-কম্বিনেশন করার চেষ্টা করতে ক্ষতি কী? বড় দল, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ইফতার আয়োজনে কে কে শরিক হচ্ছেন, এ নিয়ে নানা অনুমান ও গুজব তৈরি হয়। জোটগুলোর পুনর্বিন্যাস হবে কি না, তা নিয়ে আন্দাজনির্ভর কথাবার্তাও চালু আছে বাজারে।
উপলক্ষ ইফতার হলেও খাওয়া এবং মোনাজাতেই সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। নেতারা রাজনৈতিক বক্তব্যও দেন। এসব বক্তব্য দেওয়ার সময় তাঁরা সব ক্ষেত্রে রমজানের সংযম মেনে চলেন, তা বলা যাবে না।

আমাদের সম্প্রচার গণমাধ্যমের জগৎটা এখন অনেক বড়, সেখানে অনেক মালিক। দর্শক-শ্রোতা ধরে রাখার জন্য তাঁরা প্রাণপাত করছেন। নাগরিকদের রসনা উসকে দেওয়ার জন্য তাঁরা প্রতিদিন ঘটা করে এবং পাল্লা দিয়ে রান্নাবান্নার অনুষ্ঠান চালাচ্ছেন। এসব খাবারের সঙ্গে রোজার কোনো সম্পর্ক নেই। সারা বছরই এগুলো খাওয়া যায় এবং এগুলোর অনেকটাই মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তো এটা সমানে চলছে। সেই সঙ্গে চলছে ইফতার–রাজনীতির প্রদর্শন ও প্রচার। আমরা টেলিভিশনের পর্দায় চটজলদি খবরটা পেয়ে যাই, কে কার সঙ্গে বসে কথা বলছেন, ইফতার করছেন এবং হাসাহাসি করছেন।

রাজনৈতিক দলের ঘটা করে ইফতার পার্টির আয়োজন একটা সাম্প্রতিক প্রবণতা। পাকিস্তান আমলে, বিশেষ করে আইয়ুব-মোনায়েমের বনিয়াদি গণতন্ত্রের জমানায় এ ধরনের ইফতার পার্টি নজরে পড়েনি। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ ধরনের কোনো ইফতার পার্টি দিয়েছেন বলে মনে পড়ছে না। কিন্তু এখন এটা রাজনীতির সঙ্গে যেন জড়িয়ে গেছে। কোনো কোনো লোককে দেখেছি, মাসের পনেরো দিনই কোথাও না কোথাও ইফতারের দাওয়াতে যাচ্ছেন। বোঝা যাচ্ছে, রোজার মাসে সভা-মিছিল ইত্যাদির আয়োজন করার নানা অসুবিধা থাকায় ইফতার পার্টির মাধ্যমেই দলগুলো তাদের চাঙা রাখে এবং সংবাদ শিরোনাম হয়।

কিন্তু যেভাবে প্যান্ডেল বানিয়ে বা মিলনায়তন ভাড়া করে ইফতার পার্টির আয়োজন হয়, তার খরচ তো কম নয়। কোথা থেকে আসে এত টাকা? দলগুলো যখন নির্বাচন কমিশনে খরচের হিসাব দেয়, তাতে ইফতার পার্টির খরচের হিসাবটা থাকে কি না, তা জানতে বড় ইচ্ছা হয়।
এবারের রোজা পড়েছে গ্রীষ্মকালে। রোজাদারদের কমপক্ষে ১৫ ঘণ্টা পানাহার থেকে বিরত থাকতে হয়। ওই সময় বিভিন্ন ইফতার পার্টিতে হাজিরা দিতে হলে দরকার প্রচণ্ড ধৈর্য ও প্রাণশক্তি। এসব ইফতার পার্টিতে যাঁরা শরিক হন, আমার বিশ্বাস, তাঁরা সবাই রোজা থাকেন, সবাই ইমানদার বান্দা। আমি তাঁদের সুস্বাস্থ্য ও প্রাণপ্রাচুর্য দেখে ঈর্ষা বোধ করি।

যত দিন যাবে, ইফতার–রাজনীতি ততই এগোবে। ইতিমধ্যে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের ইফতারের দাওয়াত দিয়েছেন। অতীতের ধারা যদি বজায় থাকে, তাহলে অনায়াসে বলা যায় যে তাঁরা ওই দাওয়াত কবুল করবেন না। আওয়ামী লীগ থেকেও এবার বিএনপির নেতাদের ইফতারের দাওয়াত সৌজন্যবশত দেওয়া হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। দাওয়াত না দেওয়ার যুক্তি অবশ্য একটা আছে। বিএনপি আগুন-সন্ত্রাসী, তাদের সঙ্গে বসে আবার কিসের ইফতার?
কয়েক দিন পরই শুরু হবে ওমরাহ পালনের উদ্দেশে্য মক্কা যাওয়ার তোড়জোড়। শুনেছি, ওখানে গিয়ে দুই দলের অনেক নেতাই একসঙ্গে ইফতার করেন, কাবা শরিফ তওয়াফ করেন। কিন্তু দেশের ভেতরে প্রকাশ্যে এটা সম্ভব নয়। তবে গোপনে মেলামেশা চলছে অবাধেই। দুই তরফের মধ্যে বিয়েশাদির এন্তেজামও হচ্ছে। রাজনীতির মাঠে প্রবল শত্রু, কিন্তু ভেতরে-ভেতরে পরমাত্মীয়, এমন উদাহরণ আছে অনেক।

কোনো সামাজিক উৎসবে কিংবা ধর্মীয় পার্বণে মতের ঊর্ধ্বে উঠে একসঙ্গে বসা ও খানাপিনা করার নেওয়াজ বোধ হয় উঠেই যাবে। তারপরও কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তাঁর বান্দাদের হেফাজত করেন, হিংসা দূর করে মন পরিষ্কার করে দেন। অন্তত এই মাসটা যেন তাঁরা ভালো কথা বলেন, সত্য বলেন। (প্রথম আলোর সৌজন্যে)।
 

মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।
mohi2005@gmail.com