বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১০ ফাল্গুন ১৪২৪
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

ভোট হলেও সঙ্কটেই থাকল যুক্তরাজ্য

ডেস্ক রিপোর্ট | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2017-06-10 13:16:01

ঠিক এক বছর আগে গণভোটে ইইউ ছাড়ার রায় আসার ধাক্কা সামলে উঠতে আগাম নির্বাচন করলেও তা আরও গাড্ডায় ফেলেছে যুক্তরাজ্যকে।

বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে কোনো দলই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে দুর্বল জোট সরকারই ইউরোপ তথা বিশ্বের প্রভাবশালী দেশটির ভবিষ্যৎ।

এতে ব্রেক্সিট নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া যেমন জটিলতায় পড়ল, তেমনি দুর্বল সরকারের অধীনে দেশ পরিচালনার ঝুঁকিও যুক্তরাজ্যের সামনে। পাশাপাশি কিছু দিনের মধ্যে আবার নির্বাচনের সম্ভাবনাও এখন উড়িয়ে দেওয়ার নয়।

পার্লামেন্টের মেয়াদ আরও তিন বছর বাকি থাকলেও গত বছর ব্রেক্সিটের পক্ষে অপ্রত্যাশিত গণরায়ের পর ডেভিড ক্যামেরন সরে গেলে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে আকস্মিকভাবেই আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন টেরিজা মে।

ইইউর সঙ্গে ব্রেক্সিট আলোচনায় শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে অংশগ্রহণ করতেই তিনি আগাম ভোটের এই জুয়া খেলেছিলেন বলে রাজনীতি বিশ্লেষকদের ভাষ্য।

কিন্তু সেই বাজিতে কাজ হয়নি; বরং পার্লামেন্টে আসন ১২টি কমে এখন সরকার গঠনের জন্য অন্যের দ্বারে ঘুরতে হবে টোরি দলকে।

ভোটের ফলের পর লেবার পার্টির নেতা জেরমি করবিন প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে টেরিজা মেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানালেও তিনি তাতে সাড়া না দিয়ে বলেছেন, এখন দেশের প্রয়োজন স্থিতিশীলতা।

টোরিদের কাছ থেকে পিছিয়ে থাকলেও ভোটের হার ও আসন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে তুলেছে করবিন নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি। দলকে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে অনেকটাই সফল মানতে হবে মধ্য বামপন্থি দলটির কট্টর বাম নেতা হিসেবে পরিচিত এই রাজনীতিককে।

ভোট পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যেভাবে লেবাররা এগিয়েছে, তাতে লন্ডনে সম্প্রতি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা দুটি না ঘটলে হয়ত লেবারদের ফল আরও ভাল হত।

লেবার পার্টির হয়ে বাঙালি তিন কন্যা টিউলিপ সিদ্দিক, রুশনারা আলী ও রূপা হকের বিশাল জয়ই লেবারদের জনপ্রিয়তা বাড়ার নজির।

রুশনারা তার আসনে রক্ষণশীল প্রার্থীর সঙ্গে ভোটের ব্যবধান গতবারের চেয়ে ১০ হাজার বাড়িয়েছেন; টিউলিপ ও রুপা গতবার অল্প ভোটে জয়ী হলেও এবার ব্যবধান করেছেন কয়েকগুণ। 

করবিন ভোটের ফলে খুশি হয়ে বলছেন, এটা ভবিষ্যতের জন্য আশা জাগানিয়া।

যুক্তরাজ্যে এবার ভোটার গতবারের চেয়ে ৪ লাখ বেড়ে হয় ৪ কোটি ৬৮ লাখ। তার মধ্যে প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোট দিয়েছেন।

৬৫০ আসনের যুক্তরাজ্য পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য যে কোনো দলের ৩২৬টি আসন প্রয়োজন হয়।

ভোটের ফল

রক্ষণশীল দল: পেয়েছে ৩১৮টি আসন, যা গতবারের চেয়ে ১২টি কম; তবে তাদের ভোট বেড়েছে সাড়ে শতাংশ; এবার তাদের ভোটের হার ৪২ শতাংশ

লেবার পার্টি: পেয়েছে ২৬১টি আসন, যা গতবারের চেয়ে ২৯টি বেশি; তাদের ভোট বেড়েছে সাড়ে শতাংশ; এবার ভোট পেয়েছে ৪০ শতাংশ

স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (এসএনপি): আসন পেয়েছে ৩৫টি, যা গতবারের চেয়ে ২১টি কম; তাদের ভোট প্রায় শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে . শতাংশে

লিবারাল ডেমোক্র্যাট পার্টি (লিবডেম): আসন পেয়েছে ১২টি, যা গতবারের চেয়ে পাঁচটি বেশি; তাদের ভোট . শতাংশ কমলেও ভোটের হার শতাংশের উপরে রয়েছে

ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টি: তাদের আসন ১০টি, যা গতবারের চেয়ে দুটি বেশি; তাদের ভোট . শতাংশ বাড়লেও ভোটের হার শতাংশ ছাড়ায়নি এবারও

# ভরাডুবি হয়েছে ব্রেক্সিট ভোটে আলোচনায় উঠে আসা নাইজেল ফারাজের ডানপন্থি দল ইউকে ইন্ডিপেন্ডেন্স পার্টির। একমাত্র আসনটি হারানোর পাশাপাশি তাদের ভোট কমেছে ১০ শতাংশ

এখন কী হবে?

একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কারও না থাকলেও ভোটে এগিয়ে থাকায় সরকার গঠনের দৌড়েও এগিয়ে থাকবেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে।

পদত্যাগ করতে লেবার নেতা করবিন আহ্বান জানালেও তিনি যে সে পথে হাঁটছেন না, তা তার পদক্ষেপেই স্পষ্ট।

ভোটে বড় ধাক্কা খেলেও তা সামলে উঠে সরকার গঠনের জন্য রানি এলিজাবেথের অনুমতি নিতে তার বাকিংহাম প্যালেসে যাওয়ার খবর দিয়েছে রয়টার্স।

সরকার গঠনের জন্য রক্ষণশীলদের আটটি আসন কম আছে বলে টেরিজা ইউনিয়নিস্ট পার্টির সমর্থন চাইবেন বলে খবর এসেছে, যাদের আসন ১০টি। অর্থাৎ তারা এক হলে একটি জোট সরকার গঠন করতে পারবেন।

আগামী ১৩ জুন হাউস অব কমন্স অর্থাৎ পার্লামেন্টের নিম্ন কক্ষের প্রথম সভা বসবে, তার আগেই জোট সরকারের যাবতীয় দর কষাকষি সেরে ফেলতে হবে ৬০ বছর বয়সী টেরিজাকে।

নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ইউনিয়নিস্ট পার্টি ইতোমধ্যে ইঙ্গিত করেছে টোরিদের সমর্থন দিতে তাদের আপত্তি নেই, তবে প্রতিটি বিষয়ে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে।

টোরিদের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে প্রধানমন্ত্রী যে টেরিজাকেই হতে হবে, তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে সরকার গড়লে তিনি যে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা নিয়ে কোনো অস্পষ্টতাও নেই।

টেরিজা যদি সরকার গঠনে ব্যর্থ হন, তবে সুযোগ আসবে করবিনের জন্য। তাকে তখন ৩২৬ জন পার্লামেন্ট সদস্যের সমর্থন দেখাতে হবে।

লেবারদের আসন ২৬১ এর সঙ্গে শুধু এসএনপি ও লিবডেমকে নিলেই চলবে না, আরও কয়েকটি দলের সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে করবিনকে এবং সেটা বেশ দুরূহ।

এসএনপি নেতা নিকোলা স্ট্রারগন একটি প্রগতিশীল সরকারকে সমর্থন দিতে রাজি হলেও লিবডেম বলে দিয়েছে, কারও সঙ্গেই জোটে যাবে না তারা।

লেবার প্রার্থীর কাছে ভোটে হেরে যাওয়া লিবডেমদের নেতা নিক ক্লেইগ বলেছেন, যুক্তরাজ্য এখন স্পষ্টতই বিভক্ত, নতুন পার্লামেন্টের চ্যালেঞ্জ হবে এমন একটি সরকার গড়া, যা দেশের এই বিভেদ মুছতে সচেষ্ট হবে।

গ্রিন পার্টি সরকার গঠনে লেবারদের সমর্থন দিতে রাজি হলেও পার্লামেন্টে তাদের আসন মাত্র একটি।

ফলে দুর্বল সরকার হলেও ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে যে টেরিজাই থেকে যাচ্ছেন, তা নিয়ে সংশয় খুব একটা নেই।

পরে কী হতে পারে?

টেরিজা প্রধানমন্ত্রী থেকে গেলেও এবারের সরকার পরিচালনা তার আগের চেয়ে কঠিন হবে।

কারণ এবার জোটসঙ্গী দলটির মত রেখেও চলতে হবে তাকে। আর দলটি নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ইউনিয়নিস্ট পার্টি বলে তা আরও জটিল হবে টেরিজার জন্য।

সরকারের নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও পার্লামেন্টের সমর্থন নিতে অন্য দলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে টেরিজাকে, ফলে তা তার কাজকে করবে বিঘ্নিত।

করবিন প্রতিপক্ষ টেরিজাকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “তিনি যা পেয়েছেন তা হল; রক্ষণশীলরা আসন হারিয়েছে, ভোট হারিয়েছে, সমর্থন হারিয়েছে এবং আত্মবিশ্বাস হারিয়েছে।

“আমার মনে হয়, তার সরে দাঁড়ানোর জন্য এসব কারণই যথেষ্ট। বিশেষ করে এমন একটি সরকারের জন্য পথ ছেড়ে দেওয়া, যারা সত্যিকার অর্থেই এ দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে।”

তার পাল্টায় টেরিজা বলেছেন, “দেশে এই মুহূর্তে জন্য অন্য যে কোনো কিছুর চাইতে স্থিতিশীলতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।”

টেরিজা সরকার গঠনের পথে এগিয়ে গেলেও দলের মধ্যে তার নেতৃত্ব নিয়ে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।

তার সরকারের এক মন্ত্রী বিবিসিকে বলেছেন, দেখা যাক ভোট শেষে টেরিজা নিজেকে নিয়ে কী করেন। টোরি এমপি আনা সাব্রে বলেছেন, টেরিজা মে’র এখন তার পদ নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা উচিৎ।  

টেরিজার পতন ঘটতে পারে যদি পার্লামেন্টে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা আনা যায়। সেক্ষেত্রে বিরোধী পক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট নিশ্চিত করতে হবে, অর্থাৎ টোরিদের বন্ধুশূন্য করতে হবে।

তখন সরকার গঠন করতে কেউ না পারলে আরেকটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে পড়তে হবে যুক্তরাজ্যকে।

আবার ওয়েস্টমিনস্টারে দুর্বল সরকার গঠনকারী দলকে আগাম নির্বাচন দিয়ে শক্তিশালী অবস্থান নেওয়ার নজিরও যুক্তরাজ্যে দেখা গেছে; যদিও টেরিজার ক্ষেত্রে একই জুয়া আবার খেলার সম্ভাবনা রাজনীতি বিশ্লেষকরা কমই দেখছেন।

তবে যাই হোক না কেন, সরকারের খুঁড়িয়ে চলার মধ্যে আরেকটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঝুঁকি যুক্তরাজ্যের থেকেই যাচ্ছে।

প্রভাব ব্রেক্সিটে, অর্থনীতিতে

আগামী ১৯ জুন থেকে ইইউর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট আলোচনা শুরুর কথা রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাজ্যের ভোটের ফল তা জটিল করে তুলল।

ইউরোপীয় কমিশনে জার্মান প্রতিনিধি গুন্থা ওটিনা বলেন, “আমাদের এমন একটি সরকার প্রয়োজন যারা কাজ করতে পারবে। আলোচনার অংশীদার দুর্বল হলে সেখানে আলোচনার ফল উভয় পক্ষের জন্যই খারাপ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আমার মনে হয় এখন পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।”

ব্রেক্সিট আলোচনা আরও ‘দীর্ঘায়িত এবং জটিল’ হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার্দো ফিলিপও।

ইইউ গঠনতন্ত্রের ‘আর্টিকেল ফিফটি’ অনুযায়ী কোনো দেশকে ইইউ ত্যাগের জন্য দুই বছর সময় বেঁধে দেওয়া আছে।

অর্থাৎ, লিসবন চুক্তির আর্টিকেল ফিফটি কার্যকরের পর দুই বছরের মধ্যে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া শেষ করে ইউউ থেকে যুক্তরাজ্যকে বেরিয়ে যেতে হবে। সে হিসাবে যুক্তরাজ্যের হাতে ২০১৯ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সময় আছে।

জার্মানির ইউরোপ বিষয়কমন্ত্রী মিশায়েল রোথ বলেন, আলোচনার মাধ্যমে দুই বছরের মধ্যে একটি চুক্তিতে উপনীত হতে হলে হাতে খুব বেশি সময় নেই।

টেরিজা মে নিজে ব্রেক্সিটের বিপক্ষে থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি সফল ব্রেক্সিট আলোচনার জন্য সব কিছু করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

কিন্তু এখন দুর্বল সরকার নিয়ে তিনি কতটা এগোতে পারবেন, তা নিয়েই দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য আলোচনা শুরুর জন্য আরও সময় চাইতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে লেবার নেতা করবিন নির্ধারিত সময়েই আলোচনা শুরুর পক্ষপাতি।

এদিকে ঝুলন্ত পার্লামেন্টের আভাসে যুক্তরাজ্যের মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, পাউন্ডের দাম দ্রুত পড়ে যায়, যদিও পরে আবার ওঠে। শেয়ার বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

আবার লন্ডনে কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে যুক্তরাজ্যবাসীর।   

সবকিছু মিলিয়ে নিজের আকাশে কালো মেঘ নিয়েই ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করতে হবে টেরিজা মে’কে।

 

 

ঢাকা/ এইচ আর