সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

হ্যালো! ১০৯?

উম্মে মুসলিমা | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2017-06-16 14:50:48

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুমানা মঞ্জুর যখন স্বামী কর্তৃক ভয়াবহভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তখন তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও অনেকে বিরক্তও হয়েছিলেন। চূড়ান্ত নির্যাতনের আগে তাঁকে কয়েক দফায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। তিনি কেবল উচ্চশিক্ষিতই নন, এ দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষকও। স্বনির্ভর, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধসম্পন্ন।

তাঁর স্বামীর কর্তৃত্বপরায়ণ আচরণকে তিনি দিনের পর দিন সংসার রক্ষা ও সন্তানের মঙ্গলের দোহাই দিয়ে মেনে নিচ্ছিলেন। একজন ধীশক্তিসম্পন্ন নারীকে সঙ্গীর সহিংস আচরণের পরিণতি ব্যাখ্যা করার ব্যর্থতায় পঙ্গুত্ব বরণ করতে হলো। যে নারীর আত্মবিশ্বাস, আত্মনির্ভরতা, অনুশীলন ও অর্জন বর্তমানে বিশ্বের বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন মোতাবেক সহিংসতার শিকার নারী ও শিশু কিংবা তার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা কেউ দেশের যেকোনো স্থান থেকে যেকোনো সময় ১০৯ নম্বরে ফোন করে বিনা মূল্যে এ-সম্পর্কিত সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, বাল্যবিবাহ বন্ধ, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুকে উদ্ধারের ক্ষেত্রে এ হেল্পলাইন কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

বিটিআরসির পরিসংখ্যানমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে মোবাইল ফোনের গ্রাহকসংখ্যা ১৩ কোটি ১৯ লাখ। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী তখন প্রায় ১৫ কোটি জনসংখ্যার খানা ছিল ৩ কোটি ২১ লাখের মতো। এ কয় বছরে খানা বেড়ে না হয় সাড়ে ৪ কোটিই হয়েছে। ধরে নেওয়া যাক, প্রতি খানায় ৪ জন সদস্যের ২ থেকে ৩ জনের হাতেই মোবাইল রয়েছে। কিন্তু সবাই কি ১০৯ নম্বরের উপকারিতার কথা জানেন?

শুধু রুমানা মঞ্জুরের উদাহরণ দিয়ে শেষ করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু চিকিৎসক শামারুখ মেহজাবিন, ব্যাংকার আরিফুন্নেসার মতো আরও কত স্বনির্ভর নারী সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, তার প্রমাণ দৈনিক পত্রিকাগুলো। তনু, আফসানা, খাদিজা, রিসা, পূজা, আয়েশার স্মৃতি ম্লান হতে না হতে নতুন নতুন নাম সংযোজিত হচ্ছে। যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে অহরহ। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের বলি হয়ে চলেছেন নারীরা। কিছু প্রকাশ পেলেও বেশির ভাগই থেকে যাচ্ছে অন্তরালে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৫ সালে ৯৯৬ জন নারী ও শিশু পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪৮ শতাংশকে (৪৮২ জন) স্বামী হত্যা করেছেন এবং পারিবারিক সহিংসতার কারণে ১৪৫ জন (মোট পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুর ১৫ শতাংশ) আত্মহত্যা করেছে। এসব পরিসংখ্যান করা হয় মূলত সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে। প্রকৃতপক্ষে প্রতিদিন কতশত নারী নির্যাতনের শিকার হন, এর সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন।

শেষমেশ আসি বনানী ধর্ষণকাণ্ডে। রুমানা মঞ্জুর না হয় পুলিশের হেল্পলাইনের সুবিধা পাননি। কিন্তু মেয়ে দুজন যখন ধর্ষণের শিকার হন, তখন তাঁদের হাতে মোবাইল ফোন ছিল। বলা বাহুল্য, তাঁরা উচ্চশিক্ষিত। যখন তাঁরা বিপদ আঁচ করতে পারছিলেন, তখন ১০৯ কেন ব্যবহার করলেন না? কিংবা যখন পুলিশ তাঁদের মামলা নিচ্ছিল না, তখনো কেন ১০৯-এ ফোন করলেন না? হয়তো তাঁরা বলবেন, সরাসরি পুলিশের সামনে বসে অভিযোগ করলেও যখন কোনো সুরাহা হয় না, তখন ফোন কতটা নির্ভরযোগ্য? ধরে নেওয়া যাক, ১০৯-এ কেউ ফোন ধরলেন না কিংবা ধরে সাহায্যের হাত বাড়ালেন না বা সাহায্যের পরিবর্তে সাহায্যপ্রার্থীকে প্রকারান্তরে দোষারোপ করতে লাগলেন—এগুলো আগেভাগেই ফোনে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে থানায় অভিযোগ বা আইনি সহায়তার জন্য তা বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

আমাদের সমাজে এখনো যৌন নির্যাতনের শিকার নারীকেই তাঁর শরীর, উসকানিমূলক আচরণ ও পোশাক-আশাকের জন্য দায়ী করা হয়। এ ধারণা এই সমাজের মস্তিষ্কে এমনই বদ্ধমূল যে ১৩ জুন কুষ্টিয়ায় এক বাক্‌প্রতিবন্ধী তরুণী এক যৌন নির্যাতকের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করেও আত্মহত্যায় গ্লানি মুছতে চেয়েছেন। কিন্তু পাঁচ বছর বা তার চেয়ে কম বয়সের শিশুদের ধর্ষণ উপরিউক্ত কারণে না হলে তখন ধর্ষককে অপ্রকৃতিস্থ বা পাগল আখ্যা দেওয়া হয়। যেমন অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে কোনো নারী আত্মহত্যা করলে বা পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে চাইলে তাঁকে মানসিক প্রতিবন্ধী বলে প্রচার করা হয়।

বনানী ধর্ষণের শিকার নির্ভয়া তরুণীদ্বয় হেল্পলাইনের আশ্রয় না নিলেও আমাদের মানসিক স্থবিরতাকে অনেকখানি সচল করে দিয়েছেন। ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির শিকার হলে নারীর সম্মান, সম্ভ্রম বা শ্লীলতার হানি হয় না, হয় নির্যাতকের। মানুষ এখন নির্যাতকদের করুণ পরিণতি চাক্ষুষ করছে। তবে যত দিন না বিকৃতি, ক্ষমতা, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব লুপ্ত হবে, তত দিন নিপীড়নের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করার উপায়গুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ১০৯ এমনই এক ব্রহ্মাস্ত্র। পরিবারে মা-বাবা বা বয়োজ্যেষ্ঠরা কন্যাসন্তানদের যেকোনো ধরনের হয়রানিতে ১০৯-এ ফোন করে পুলিশের সহায়তা নেওয়ার কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দেবেন। এমনকি পরিবারের ভেতর আত্মীয়-অনাত্মীয় কারও দ্বারা আক্রান্ত হলেও জানাতে হবে। তবে ছেলেশিশু, বালক বা তৃতীয় লিঙ্গের কেউ যৌন হয়রানির শিকার হলে সে ক্ষেত্রে কোন আইনি সহায়তা তাঁরা গ্রহণ করবেন, তা আমাদের জানা নেই। বিবাহিত নারীরা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের আচরণে বেচাল দেখলে চরম সহিংসতা সংঘটনের আগেই ১০৯-এ কল করবেন। সরকারি-বেসরকারি-ব্যক্তি উদ্যোগে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, যানবাহন, যাত্রীছাউনি, হাসপাতাল, বাড়িঘর, দোকানপাটে ১০৯ নম্বরটির উপযোগিতাসংবলিত স্টিকার লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে মাঝেমধ্যেই মোবাইলে এ বিষয়ে খুদে বার্তা পাঠাতে হবে।

সবার আগে এই নম্বরের বিপরীতে সেবাদানকারী সংস্থাটিকে হতে হবে নারীবান্ধব। এ বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ১০৯ নম্বর প্রচলনের আগের নম্বর ছিল ১০৯২১। শুরুর দিকে ১০৯২১-এর উপকারিতা পেতে কলেজের এক সাহসী ছাত্রী বখাটে কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে পুলিশের সহায়তা চেয়েছিলেন। পুলিশ মেয়েটির পোশাক পর্যবেক্ষণ করে বলেছিল, ‘এ ধরনের পোশাক না পরলেই তো পারেন।’ জ্বর না হয় সারল, কিন্তু কুইনাইন না সারলে? (সূত্র: প্রথম আলো)

উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক। 

muslima.umme@gmail.com