মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

ঈদ মোবারক

আনিসুল হক | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2017-06-25 09:59:40

নাল পিরান নাটকের কথা কি আপনাদের মনে আছে? সবুজ নামের বালকটি একটা লাল জামা চেয়েছিল। রংপুরের মিঠাপুকুর থেকে তারা এসেছিল ঢাকায়, জাকাতের কাপড় সংগ্রহ করতে।

তার মায়ের নাম নালবি বেগম ছোট ভাই মুকুল ঢাকায় এসে মতিঝিল স্কুলে জাকাতপ্রার্থীদের ভিড়ে পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে মারা গিয়েছিল সবুজ এই নাটকটি কিন্তু সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত আজ থেকে প্রায় ১৮ বছর আগে এই নাটকটি নির্মিত প্রচারিত হয়েছিল সাইদুল আনাম ছিলেন পরিচালক

কী অভাবই না ছিল একদা এই বাংলাদেশে। একটা প্যান্ট, একটা শার্ট, স্কুলের ইউনিফর্ম। এর বাইরে আরেকটা শার্টের স্বপ্ন দেখাও ছিল বিলাসিতা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা গল্প করতেন, বহুজন স্কুলে গিয়েছেন লুঙ্গি পরে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট দিয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, ১৯৭২ সালে, বাজেট ছিল ৭৮৬ কোটি টাকার। আর এবারের প্রস্তাবিত বাজেট? লাখ কোটি টাকারও বেশি। তুলনাটা সহজ হবে, যদি এভাবে বলি, ৭৮৬ টাকা, আর লাখ টাকা। একটা সময় আমার বছরে ব্যয় হতো ৭৮৬ টাকা। এখন আমি বছরে খরচ করি লাখ টাকা। এখন আমি তাহলে কত বড়লোক হয়েছি

আগে সবুজেরা মারা যেত জাকাতের কাপড় সংগ্রহ করতে গিয়ে, পায়ের নিচে চাপা পড়ে মারা যেত, এখন মারা যায়পাখিড্রেস কিনতে না পারার অভিমানে, আত্মহত্যা করে। আগে আমাদের একটা লাল জামা হলেই আমরা আকাশের চাঁদ হাতে পেতাম, এখন আমরাবাহুবলীপোশাক চাই

কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখনো লোকে জাকাতের কাপড় সংগ্রহ করতে গিয়ে মারা যায়। আর এখনো ঈদে ঘরমুখী মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথে আটকে থাকে। আর প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় হাজারো মানুষ। এবারও সিমেন্টের ট্রাকে চড়ে বাড়ি ফিরতে গিয়ে মারা গেছেন বেশ কজন পোশাকশ্রমিক

আমার মনে আছে, রংপুর থেকে ঢাকা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস যখন প্রথম চালু করা হয়, যাত্রী ছিল না, বাস ফাঁকা যেত, লোকে বলত, আমরা ঠান্ডা দিয়া কী করমো? ঢাকা-সৈয়দপুর বিমান চালু করা যেত না যাত্রী-সংকটের কারণে। আর এখন? ঢাকা থেকে সৈয়দপুর রোজ তিন-চারটা বিমান চলাচল করে। টিকিট পাওয়া যায় না। আমাদের সামর্থ্য যে বেড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সেই তুলনায় প্রশাসনের দক্ষতা বাড়েনি। রাস্তায় বিশৃঙ্খলা দিন দিন বেড়েই চলেছে

আমাদের একটা সেমাই বানানোর মেশিন ছিল। অনেকটা টিউবওয়েলের মতো দেখতে। এক দিক দিয়ে আটার ময়ান ঢুকিয়ে দেওয়া হতো, হাতল ঘোরালে আরেক দিক দিয়ে সেমাই বেরোত। সেই সেমাই শুকাতে দিতে হতো রোদে। ছাদে সেমাই শুকাতে দিয়ে একটা বড় পাটখড়ি নিয়ে আমি পাশে বসে থাকতাম, পাখি তাড়ানোর জন্য। আর একটা লাঠির ডগায় কাগজের চোঙ লাগিয়ে তার সঙ্গে তার যুক্ত করে হাতে ধরতাম একটা দেশলাইয়ের প্যাকেট। হয়ে গেল আমার মাইক্রোফোন। তারপর একা একা শুরু করতাম রেডিওর কার্যক্রম। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার বই, রবীন্দ্রনাথের কবিতার বই এনেছি স্কুলের লাইব্রেরি থেকে, এমনকি ফররুখ আহমদের সাত সাগরের মাঝি, সারা দুপুর ছাদে বসে কবিতা আবৃত্তি করতাম, আপনমনে

আমাদের সেই সেমাই মেশিনটারও খুব চাহিদা ছিল। পড়শিরা সবাই ধার নিতেন। একটুখানি কষ্ট করে দু পয়সা বাঁচানোর এই সুযোগ কেই-বা ছাড়বেন? একবার রংপুরে ন্যায্যমূল্যে শার্টের কাপড় দেওয়ার ঘোষণা এল। পাবলিক লাইব্রেরির মাঠে সারা রাত লোকজন লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকল, ৩৫ টাকায় কলাপাতা রঙের একটা শার্টের কাপড়ের পিস নেওয়ার জন্য। সিনেমার টিকিট কালোবাজারিরা ভালো করল, ওরা লাইনে ঠেলাধাক্কা দিয়ে সামনে যেতে পেরেছিল। ওই শার্ট পরে যারা চলাচল করত, তাদের গৌরবই ছিল আলাদা, কারণ তারা তো বিজয়ী। জুতা-স্যান্ডেল? সবাই তাকিয়ে থাকত কবে বাটা বিরাট মূল্যহ্রাসের বিজ্ঞাপন দেবে। তখন কার্টুন বেরিয়েছিল: ‘আগের দিন এক জোড়া জুতা কিনে আপনি মাথা উঁচু করে বেড়াচ্ছেন, পরের দিন দেখলেন, ওই জুতার ওপরই বিশাল মূল্যছাড় দেওয়া হয়েছে, আপনার মনের অবস্থা কী হয়?’

পাঙাশ মাছ ছিল রূপকথা। কবি কবিতা লিখেছিলেন: পদ্মার পাঙাস, চোখ কেন রাঙাস। গল্প প্রচলিত ছিল: জামাই রাতের বেলা ভুল বকছে, পাঙাশ মাছ পাঙাশ মাছ। আর শ্বশুর ঘুমের ঘোরে জবাব দিচ্ছেন, পয়সা নাই, পয়সা নাই। সেই পাঙাশ মাছ এখন সবচেয়ে সস্তা মাছ, এবং কেউ কিনে খেতে চায় না

আহ, কী কষ্ট করে আমরা বাড়ি যেতাম। আমরা চার ভাইবোন ঢাকায় থাকতাম, সবাই ছাত্র। আম্মা বলে দিয়েছেন, এক বাসে এসো না। বাসের টিকিট পাওয়ার জন্য ভোরবেলা গাবতলী যাও। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকো। আমার ভাই সারা রাত কমলাপুরে লাইনে দাঁড়িয়েও থেকেছেন। বাসে গেলে আরিচা পর্যন্ত যাওয়ার পর অনিশ্চয়তা। ফেরি আসবে কি আসবে না। কী কষ্ট কী কষ্ট। একটা বাথরুম নেই, একটা যাত্রী ছাউনি নেই। ট্রেনে গেলে ফুলছড়ি-বাহাদুরাবাদ ঘাট। ট্রেন থেকে নেমে সবাই ছুটছে, কুলির হাতে জিনিসপত্র দিয়ে। গিয়ে দেখা গেল স্টিমার নেই। সারা রাত খোলা আকাশের নিচে বসে ছিলাম

কত যে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঈদের যাত্রায় বাসের মধ্যে বসে কাটিয়েছি। সকালবেলা বাস ছাড়বে। সকাল সকাল বাসের কাউন্টারে গিয়ে দেখি বাস নেই। রাস্তায় ভীষণ যানজট। গতকালের বাস এসেছে এখন। সেই বাস হয়তো ছাড়ল দুপুরে। বিকেল চারটায় রংপুর পৌঁছানোর কথা ছিল, পৌঁছালাম রাত তিনটায়

বাসস্ট্যান্ডে নেমে রিকশা নেওয়া। আমরা দুই ভাই। রিকশায় উঠতে গিয়ে মনে হলো, আলাউদ্দিনের মিষ্টির প্যাকেট বাসে ফেলে এসেছি। আবার দৌড়ে সেই বাস খুঁজে বের করা। তারপর রিকশায় উঠে অন্ধকার আর শীতের মধ্যে দুই ভাই ফিরছি পরিচিত রাস্তাঘাট পেরিয়ে। পুরো রংপুর শহর তখন কুয়াশার চাদর পরে ঘুমাচ্ছে। সোডিয়াম আলোয় দেখা যাচ্ছে কুকুরদের ছোটাছুটি। পথের ধারে ছিন্নমূল মানুষেরা খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাচ্ছে। পাহারাদারেরা বাঁশি বাজিয়ে টর্চলাইট দোলাতে দোলাতে চলছেন। পৌর মার্কেট, পুলিশ লাইনস, কালেক্টরেট মাঠ, ডিসি অফিস, কাছারিবাজার, জিলা স্কুল, সার্কিট হাউস। রিকশা এগোচ্ছে। ধাপের মোড়ে দুটি রিকশার মধ্যে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছেন দুজন রিকশাওয়ালা। রিকশার নিচে হারিকেন জ্বলছে। এবার রিকশা আমাদের বাড়ির পথ নিল। দুধারে বাগানঘেরা বাড়ি। টিনে ছাওয়া, রংদার, কারুকার্যময়। আর পথের দুধারে গাছ আর গাছ। কামিনী ফুলের গন্ধে কুয়াশা - করছে। শ্যামাসুন্দরী খালের উঁচু সেতু পেরোলেই আমাদের বাসা। কাঁঠালগাছ থেকে শিশির ঝরছে টিনের চালে। শব্দ হচ্ছে। সমস্ত চরাচর ঘুমিয়ে

আমরা দুই ভাই গেটে দাঁড়িয়ে বেল টিপব। অমনি দরজা খুলে গেল। আম্মা জেগে আছেন। রিকশার শব্দ পেয়েই টের পেয়েছেন, ছেলেরা এসে গেছে

ঈদ মানে মায়ের কাছে ফেরা। ভাইবোন সবার একসঙ্গে হওয়া। আব্বার কবর জিয়ারত। পুরোনো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ। পাড়ার ময়মুরব্বি-বন্ধুবান্ধবের মাঝে আবার ফিরে আসা। পাড়ার মাঠে ছেলেবুড়ো সবাই মিলে ক্রিকেট খেলতে নামা

দিনের শেষে টেলিভিশন দেখতে বসা। আহ্‌, কি সব অনুষ্ঠান হতো। হুমায়ূন আহমেদের নাটক। অভিনয় করছেন হুমায়ুন ফরীদি, আলী যাকের, আফজাল শরীফ। এরপর আনন্দমেলা। একবার উপস্থাপনা করছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তো আরেকবার আনিসুল হক। একবার আফজাল হোসেন তো আরেকবার জুয়েল আইচ। পরের সাত দিন ধরে আলোচনার একটাই বিষয়কেমন হলো ঈদের অনুষ্ঠান। আর ছিল ঈদসংখ্যা। বিচিত্রা, রোববার রশীদ করীম, সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস ছিল প্রধান আকর্ষণ। সেলিনা হোসেন, ইমদাদুল হক মিলন। কোনো কোনো লেখায় একটু যৌনতাও থাকত বটে। আবুল খায়ের মুসলেহ উদ্দিন বা আলাউদ্দীন আল আজাদে হয়তো

তারপর আবার সময় এল। চলো মন ঢাকায়। একজন একজন করে আম্মার ছেলেমেয়েরা বিদায় নিচ্ছে। একটা সময় সবাই চলে গেল। আম্মা রংপুরে একা

আমার মেয়ে যখন পড়তে বিদেশ যাচ্ছে, আমার বুক ভেঙে আসছে, আমি আম্মাকে জিজ্ঞেস করলাম, আম্মা, আপনি কী করে সহ্য করেন? এত কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের বড় করলেন, এখন কেউ কাছে থাকে না। আর আপনিও ঢাকায় এসে থাকতে চান না, ছটফট করেন, কখন রংপুর যাবেন, কী করে পারেন। আম্মা বললেন, প্রথম প্রথম খারাপ লাগে, তারপর সহ্য হয়ে যায়

গতবার ঈদে শেখ রেহানা লিখেছিলেন প্রথম আলো ঈদ উপহারে: ‘আব্বা বাইরে থাকলে মনে হতো সেটাই ঈদ বঙ্গবন্ধু প্রায়ই জেলে থাকতেন, বেগম মুজিব পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যেতেন কারাগারে, দেখা করতে, রাসেল কারাগারকে বলতআব্বার বাড়ি।তো বঙ্গবন্ধু যখন কারাগারের বাইরে থাকতেন, তার পরিবার-পরিজনের কাছে ছিল সেটাই ঈদ। একই কথা বলেছেন তাজউদ্দীনের কন্যা সিমিন হোসেন রিমি, এবারের বাবা দিবসে, প্রথম আলো ছুটির দিনেতে: আব্বা বাসায় থাকলে সেটাই ঈদ

আর এবার আমার কী মনে হচ্ছে জানেন! আমার মেয়ে আসবে ঈদের পরের দিন বিদেশ থেকে। আমার কাছে এবারের ঈদে সেটাই সবচেয়ে বড় উপলক্ষ। স্নেহ নিম্নগামী। আমার আম্মা অপেক্ষা করেন আমাদের জন্য, আমরা অপেক্ষা করি আমাদের সন্তানদের জন্য

বাংলাদেশের ঈদের এটাই সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। ঈদে সবাই তাদের উৎসে ফিরে যেতে চায়। উৎসব মানে তো মিলন। ঈদ আমাদের মিলিত করুক, মিলনের সুর বেজে উঠুক পুরো জাতির হৃদমাঝারে।ইদমোবারক। ঈদ মোবারক। (প্রথম আলো)

আনিসুল হক: সাহিত্যিক সাংবাদিক