সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

২ বছর আগে এক জঙ্গির জবানবন্দিতে যা ছিল!

Published: 2017-07-02 09:44:07

ঢাকার গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারি ও চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর ঈশা খাঁ ঘাঁটির সুরক্ষিত এলাকার দুটি মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলার অন্যতম দুই পরিকল্পনাকারীর নাম দুই বছর আগে পুলিশকে বলেছিলেন জেএমবির এক জঙ্গি। তাঁর নাম মো. এরশাদ হোসেন ওরফে মামুন ওরফে জয় ওরফে বিজয় ওরফে শুভ।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে শীর্ষ তিন জঙ্গির নাম এবং জঙ্গি তৎপরতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেও চট্টগ্রামের পুলিশ তখন তা আমলে নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

২০১৫ সালের ২৩ মার্চ চট্টগ্রাম নগরের মীর আউলিয়া মাজার রোড এলাকার একটি ভাড়া ঘর থেকে বিস্ফোরকসহ এরশাদকে (২০) ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেন স্থানীয় লোকজন। গ্রেপ্তারের ছয় দিনের মাথায় এরশাদ চট্টগ্রাম আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে রাজীব গান্ধী ও ফারদিনের নাম বলেছিলেন।

হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার অন্যতম ‘পরিকল্পনাকারী’ জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী এবং চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর ঈশা খাঁ ঘাঁটির সুরক্ষিত এলাকার দুটি মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলার পরিকল্পনাকারী রাইসুল ইসলাম খান ওরফে ফারদিন। এর মধ্যে রাজীব গান্ধীকে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি টাঙ্গাইল থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। আর ফারদিন বগুড়ায় গ্রেনেড বানাতে গিয়ে বিস্ফোরণে গত বছরের ৩ এপ্রিল মারা যান বলে পুলিশ জানায়।

এরশাদ জবানবন্দি দেওয়ার আট মাস পর ২০১৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর নৌবাহিনীর সুরক্ষিত এলাকার মসজিদে জুমার নামাজের সময় জেএমবির জঙ্গিরা বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে নৌবাহিনীর সদস্যসহ ২৪ জন মুসল্লি আহত হন। আর ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে হোলি আর্টিজান বেকারিতে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য জঙ্গি হামলা হয়। এতে প্রাণ হারান দেশি-বিদেশি ২০ নাগরিক।

ওই দুজন ছাড়াও জঙ্গি বুলবুল আহমেদ ওরফে ফুয়াদের নাম বলেছিলেন এরশাদ। ফারদিনের নেতৃত্বে ফুয়াদ ২০১৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর (এরশাদের জবানবন্দির সাত মাস পর) চট্টগ্রাম নগরের মাঝিরঘাট এলাকায় তহবিল সংগ্রহের জন্য ছিনতাই করতে যান। এতে গ্রেনেড বিস্ফোরণে জেএমবির দুই সদস্য, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাসহ তিনজন নিহত হন। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ উদ্ধার করে একে-২২ রাইফেল, গ্রেনেড ও গুলি। তখন পুলিশের ধারণা ছিল, এটি নিছক ছিনতাই।

এ ছাড়া ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর (এরশাদের জবানবন্দির ছয় মাস পর) জঙ্গি ফুয়াদ বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় কথিত ‘লেংটা ফকিরের মাজার’-এর ফকির রহমত উল্লাহ এবং তাঁর খাদেম আবদুল কাদেরকে গলা কেটে খুন করেন। গ্রেপ্তার হওয়ার (খুনের ঘটনার এক মাস পর) পর ফুয়াদ জবানবন্দিতে দুজনকে খুন করার কথা স্বীকার করেন।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের তিনজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, এরশাদ এত বেশি তথ্য দিয়েছিলেন যে তাঁর মানসিক সমস্যা থাকতে পারে বলে মনে করেছিলেন তাঁরা। তাঁর জবানবন্দি তখন গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হলে হয়তো জঙ্গি হামলার অনেক ঘটনা এড়ানো যেত। তাঁরা বলেন, জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে চট্টগ্রাম নগর পুলিশে আলাদা কোনো ইউনিট এবং এ বিষয়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তা না থাকার কারণে এমনটি হয়েছে।

তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম মোহাম্মদ রহমত আলীর আদালতে এরশাদ ২০১৫ সালের ২৯ মার্চ ৯ পৃষ্ঠার জবানবন্দি দেন। এতে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার বালান্দোর এলাকার রিয়াজুল ইসলামের ছেলে এরশাদ কীভাবে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নেন, সে বর্ণনা রয়েছে। এতে তিনি উল্লেখ করেন, চট্টগ্রামের কর্নেলহাট এলাকায় ফারদিনের (বগুড়ায় নিহত জঙ্গি) ভাড়া বাসায় একে-২২ ও একে-৪৭ রাইফেল চালানোর প্রশিক্ষণ নেন তিনি। ২০১৪ সালে ফারদিনের সঙ্গে অস্ত্র কিনতে বান্দরবান যান। কিন্তু সেবার তাঁদের সঙ্গে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় অস্ত্র কিনতে পারেননি। এ ছাড়া ধরা পড়ার কয়েক মাস আগে ঢাকায় রাজীব গান্ধীর কাছে অস্ত্র পাঠান তিনি। কিন্তু কী ধরনের অস্ত্র এবং কতটি অস্ত্র, জবানবন্দিতে তা বলেননি তিনি। চট্টগ্রামের এ কে খান গেট এলাকায় ফারদিনই তাঁকে ফটোকপির দোকান করে দেন। ফারদিনের বাসায় থাকতেন তিনি। তাঁর দোকানে কারা আসত, তাদের অনেকের নামও বলেছেন তিনি।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, এরশাদ যখন এসব তথ্য প্রকাশ করেন তখন দেশে জেএমবির তাণ্ডব সেভাবে ছিল না। তাই বিষয়টি তাঁদের কাছে তেমন গুরুত্ব পায়নি।

চট্টগ্রামের সদরঘাটে ছিনতাইয়ের ওই ঘটনার ১৩ দিন পর ২০১৫ সালের ৫ অক্টোবর কর্ণফুলী থানার খোয়াজনগর এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে গ্রেনেড, অস্ত্র-গুলিসহ জেএমবির পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে দুজন বুলবুল আহমেদ ওরফে ফুয়াদ এবং মো. সুজন আদালতে জবানবন্দিতে বলেন, ফারদিনের নেতৃত্বে তাঁরা তহবিল সংগ্রহের জন্য ওই ছিনতাই করেন। পরে মাজারে জোড়া খুনের ঘটনা ঘটান।

গত ৫ জুন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে একটি মামলায় এরশাদকে আদালতে হাজির করা হয়। দুপুরে প্রিজন ভ্যানে ওঠার আগে পুলিশের উপস্থিতিতে এরশাদ বলেন, ‘যা বলার গ্রেপ্তারের পর আদালতে বলেছি।’

গত দুই বছরে কারাগারে এরশাদের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর পরিবারের কেউ আসেননি বলে জানান চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কারাধ্যক্ষ মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান।

গত ৩০ জুন সন্ধ্যায় দিনাজপুরের বিরল উপজেলার বালান্দোর এলাকার সরকারপাড়ায় গিয়ে এরশাদের মা-বাবা ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলা হয়। তাঁর বাবা বর্গাচাষি মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, তাঁর দুই ছেলে, দুই মেয়ে। এরশাদ সবার ছোট। বালান্দোর উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ২০১১ সালের ২৮ অক্টোবর কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে চলে যায় এরশাদ। অনেক খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি। এরপর ২০১৫ সালের ২৩ মার্চ এরশাদকে চট্টগ্রামে জঙ্গি সন্দেহে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে—টেলভিশন ও পত্রিকায় এমন খবর দেখতে পান তিনি। পরে চট্টগ্রাম আদালতে এসে ছেলের সঙ্গে একবার দেখা করেছেন। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় দিনাজপুর থেকে চট্টগ্রামে আর দেখা করতে যাননি। ছেলে জঙ্গি নয়, চক্রান্তের শিকার বলে দাবি করেন তিনি।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে এরশাদ বলেন, বালান্দোর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় শায়খ আবদুর রহমানের (২০০৭ সালের ৩০ মার্চ ফাঁসি কার্যকর হয়) বই পড়ে তিনি জেএমবির সঙ্গে যুক্ত হন। একসময় মা-বাবাকে না জানিয়ে তিনি ধর্মের জন্য ঘর ছাড়েন।

জঙ্গির দেওয়া জবানবন্দি আমলে না নেওয়ার বিষয়ে চট্টগ্রাম নগর পুলিশ কমিশনার মো. ইকবাল বাহার বলেন, গ্রেপ্তারের পর এরশাদের দেওয়া তথ্য সেই সময় পুলিশ কেন যাচাই-বাছাই করেনি, তা তাঁর জানা নেই। এখন জঙ্গি দমনে পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

দায়িত্বে অবহেলা করা পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি রতন কুমার রায়। তিনি বলেন, জঙ্গি এরশাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য তখন গুরুত্ব দিয়ে যাচাই-বাছাই করা হলে আগেই অনেক রহস্যের জট খুলত। (প্রথম আলোর সৌজন্যে)

 

 

ঢাকা/ এইচ আর