বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৮, ১৩ বৈশাখ ১৪২৫
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

সান্ধ্য কোর্সে নিম্নমানের গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে

আলী ইমাম মজুমদার | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2017-07-03 22:26:01

শিরোনামটা প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি সংবাদের। আর বক্তব্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ কামাল উদ্দিনের সিনেট অধিবেশনের বাজেট বক্তৃতা থেকে নেওয়া। খবরটি এসেছে আরও কিছু কাগজেও। বক্তৃতায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বেশ কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্যকালীন কোর্স নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।

উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি বিভাগে সান্ধ্যকালীন কোর্স খোলা হয়েছে কামাল উদ্দিনের মতে, এসব কোর্সে কখনো কখনো ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই নিম্নমানের শিক্ষার্থী ভর্তি করার অভিযোগ রয়েছে সিনেট সভায় তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, এই কোর্সের মাধ্যমে শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল অর্থ লাভের আশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অসংখ্য নিম্নমানের গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে এর মাধ্যমে একশ্রেণির শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করছেন তিনি এই শ্রেণির শিক্ষকদেরশিক্ষক দোকানদারবলেও মন্তব্য করেন

কামাল উদ্দিনের মতে, তাঁরা জ্ঞান দক্ষতার পার্থক্য জানেন না অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলে গেছেন। সান্ধ্য কোর্সগুলোর রিপোর্ট তৈরি করতে একটি কমিটি গঠন এবং এসব কোর্স থেকে আয়ের ৪০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে জমা দেওয়ার বিধান করতেও তিনি বলেন। সিনেটের আলোচনায় একাধিক সদস্য কোষাধ্যক্ষের বক্তব্যকে সমর্থন জানান বলে খবরে উল্লেখ রয়েছে। উল্লেখ্য, অধিবেশনের সূচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কোনো অবস্থাতেই বাণিজ্যকেন্দ্র নয়। এটি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে।

উপাচার্য কোষাধ্যক্ষের বক্তব্য একই বিষয় নিয়ে কি না, তা অস্পষ্ট। তবে তা অনেকটা সমার্থক। আরও তাৎপর্যপূর্ণ যে এই বক্তব্য সংবাদপত্রে প্রকাশের পর এর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে কোনো পক্ষের অন্য কোনো মতামত লক্ষ করা যায়নি

কিছুকাল ধরে অনেক বেশি টাকা ফি নিয়ে সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু হয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনো কোনো বিভাগে। উল্লেখ্য, এমনিতেই এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বেতন অন্যান্য ফি অনেক কম। এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তিও আছে। তবে একরূপ স্থিতাবস্থা রয়েছে লম্বা সময়কাল। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য ব্যয় সরকারই বহন করে। গবেষণার মতো কোনো কোনো খাতে বরাদ্দের অপ্রতুলতা নিয়ে অভিযোগ থাকলেও অবকাঠামো নির্মাণসহ উন্নয়ন চলতি ব্যয় সরকারই বহন করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান নিম্নমুখী বলে কয়েক দশক ধরে আলোচনা হচ্ছিল। অথচ আগে এগুলো বিশ্বসমাজে মর্যাদার আসনে ছিল। অবক্ষয়ের একটি কারণ হিসেবে শিক্ষকদের অনেকে প্রায় সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক ভূমিকা রাখছেন বলে কারও কারও ধারণা। পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন নিয়োগও একটি কারণ বলে মনে করা হয়। ছাড়া কেউ কনসালট্যান্সি করছেন খণ্ডকালীন। এত কিছু যাঁরা করেন, তাঁরা মূল কাজে অখণ্ড মনোযোগ দিতে সক্ষম হবেন, এটা আশা করা যায় না। সবকিছু মিলিয়ে অবস্থাটাকে আরও ভারী করল কিছুসংখ্যক বিভাগের সান্ধ্যকালীন কোর্স

উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়মিত কোর্সের বেতন ফি কিছুটা বৃদ্ধি করলেই তুলকালাম হয়। অথচ সান্ধ্য কোর্সে মোটা অঙ্কের ফি দিয়ে নির্বিবাদে ভর্তি হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। আরও আলোচনায় আসবে, এসব ফি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল আয়-ব্যয়কেন্দ্রিক হিসাবের মধ্যে আছে কি না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত। তবে নিজেদের মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় আর্থিক সমন্বয় বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকতে হবে। ভিন্নতর শুধু হতে পারে স্বশাসিত ইনস্টিটিউটের ক্ষেত্রে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব কোর্সে আয়-ব্যয়ের হিসাব কেন্দ্রীয় বাজেটের অংশ হিসেবে সিনেট অধিবেশনে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে মনে হয় না। যদি হতো, তবে কোষাধ্যক্ষ হয়তোবা সেসব হিসাবের সারসংক্ষেপ তাঁর বক্তব্যে উপস্থাপন করতেন। আর এর ওপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ থাকলে ৪০ শতাংশ কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা দেওয়ার দাবি করতেন না। তাহলে আয়ের খাত ধার্য, হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় করার কর্তৃত্ব কে বা কারা করছেন, তা অস্পষ্ট রইল। প্রশ্ন থাকছে, তাঁরা এর জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত কি না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল প্রশাসনিক কাঠামো বিশাল হিসাব বিভাগ এসব বিষয়ে উপেক্ষিত থাকলে জবাবদিহি প্রশ্নবিদ্ধ হবে

এমনিতেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মহাহিসাব নিরীক্ষক নিয়ন্ত্রকের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে শিথিল। বিষয়টি নিয়ে বেশ সমালোচনা রয়েছে। আর আলোচিত আয়-ব্যয়গুলো যদি সেই ব্যবস্থাপনার বাইরে থাকে, তবে তা আরও উদ্বেগজনক। সব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণের জন্য নিরঙ্কুশ ক্ষমতা সংবিধান মহাহিসাব নিরীক্ষক নিয়ন্ত্রককে দিয়েছে। তারা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসহ সামরিক বাহিনীর হিসাবও নিরীক্ষায় নেয়। তাহলে কি আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হিসাব ব্যবস্থাপনার এই অবস্থাটা মেনে নিতে থাকব? মনে হয় অনেকেই তা সংগত মনে করবেন না। যেমন করেননি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষসহ বেশ কয়েকজন সিনেট সদস্য। সেই সিনেট অধিবেশনে আউটসোর্সিংয়ে পাওয়া সরকারি-বেসরকারি সংস্থার নিয়োগ পরীক্ষাও নির্ধারিত ফির বিনিময়ে পরিচালনার প্রসঙ্গ এসেছে। এর হিসাব-নিকাশের ব্যবস্থাও তথৈবচ। আলোচিত হয়েছে, এই পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার ত্রুটিতে বিতর্কিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি। অন্যের কাজ ব্যাপকভাবে এভাবে করতে গেলে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক

সবকিছু মিলিয়ে আলোচনায় থাকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান এর ভাবমূর্তি। দেশে যখন বেসরকারি সংস্থার দাপটে এবং সরকারিগুলোর অকার্যকারিতায় বেসরকারি খাত প্রায় সব ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে শিক্ষা খাত একটু ভিন্ন। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো মূলত সর্বত্র সরকারি। এগুলোর মান প্রশ্নবিদ্ধ। এদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আসছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। সেগুলো ব্যয়বহুল হলেও তুলনামূলকভাবে অগ্রসরমাণ। অন্যদিকে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা স্তরের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মান দু-একটি সম্মানজনক ব্যতিক্রম ছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে যথেষ্ট ভালো। তদুপরি শিক্ষার ব্যয়ও কম দেখে এখানে ভর্তির প্রতিযোগিতা চলে। আর তা চলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা বোর্ডগুলোর মূল্যায়নের দৈন্যকে তুলে ধরা হয়েছে বারবার।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিছুসংখ্যক বিভাগ যদি তাদের গৌরবময় অতীত বর্তমানকে বিসর্জন দিয়ে যেকোনো কারণেই নিম্নমানের সান্ধ্য কোর্সের দিকে ঝোঁকে, তবে তা বেদনাদায়কই হবে। সান্ধ্য কোর্সে বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া ভালো শিক্ষার্থী পাওয়ার কথা নয়। আর তার যদি ব্যবস্থা করতেই হয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর চলমান মানের সঙ্গে আপস করে তা করা অসংগত হবে

তবে সান্ধ্যকালীন কোর্স অভিনব কিছু নয়। এমনকি তা নয় কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েও। প্রসঙ্গে ভারতের দুটি খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সান্ধ্য কোর্সের বিষয়টি আলোচিত হতে পারে। আইআইটি মুম্বাইয়ে কর্মরত পেশাজীবীদের জন্য এম. টেক. স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেখানে নিয়মিত এম. টেক. কোর্সটিও সান্ধ্যকালীন। তাই পেশাজীবীরা একই সিলেবাস মূল্যায়নের মাধ্যমে পড়ার সুযোগ পান। অন্যদিকে হালে উদীয়মান দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকালীন কিছু ডিপ্লোমা কোর্স রয়েছে। সেখানে সান্ধ্যকালীন কোনো স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায় না। ঠিক তেমনিভাবে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনো কোনো কোর্স চালু করলে দোষের কিছু হবে না। তবে তা করতে হবে নিয়মিত কোর্সের কোনো প্রকার বিঘ্ন না ঘটিয়ে। ভর্তিসহ মূল্যায়ন একই মানের রাখাও সংগত। আর বিবেচনায় রাখা সংগত, একই শিক্ষক বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়লে তাঁর শিক্ষাদানের মান ক্রমান্বয়ে উঁচু হওয়ার সুযোগ কম

তাই এগুলো চালাতে খুবই সুবিবেচনার পরিচয় দিতে হবে। তদুপরি আর্থিক ব্যবস্থাপনার যে দিকটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে আলোচিত হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধরনের কোর্স পরিচালনায় ফি ধার্য ব্যয় কীভাবে হবে, তা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছেই থাকতে হবে। কেননা, তাদেরই রয়েছে সিনেট সিন্ডিকেটের কাছে জবাবদিহি। আয়ের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে আসার প্রস্তাব খুবই যৌক্তিক। কেননা, এসব কোর্স পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয় অবকাঠামো আসবাবপত্র, বিদ্যুৎ, পানিসহ নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সেবা ব্যবহৃত হয়। অবশ্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ গবেষণামূলক কাজের জন্য এখান থেকে বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানাতে পারে

সান্ধ্য কোর্সে নিম্নমানের গ্র্যাজুয়েট তৈরি কিংবা এটা করতে গিয়ে আর্থিক অব্যবস্থাপনার কোনো অভিযোগ আসতে থাকুক, তা কেউ চাইতে পারে না। আর শিক্ষকেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি সম্পর্কে অন্য কারও চেয়ে কম সচেতন নন। সিনেটের আলোচনা তারই প্রতিফলন বলে ধরে নেওয়া যায়

আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

majumderali1950@gmail.com