রবিবার, ২১ জানুয়ারী ২০১৮, ৭ মাঘ ১৪২৪
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

বঙ্গবন্ধুর কথা থেকে আমরা শিখছি কি?

আনিসুল হক | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2017-08-15 13:29:47

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা দুটি বই এখন পর্যন্ত বেরিয়েছে। এগুলো তো বই হিসেবে লেখা নয়, তাঁর ডায়েরি, তাঁর মনের কথা। কারাগারে বসে লেখা, তাই সব কথা যে তিনি খোলাখুলি লিখতে পেরেছিলেন, তাও মনে হয় না। মনে রাখতে হবে, তিনি পাকিস্তানি শাসকদের কারাগারে বসে এই ডায়েরি লিখেছেন। তারপরেও তিনি যেসব কথা লিখেছেন, তা যেকোনো স্বৈরশাসকের হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

আমি বারবার করে বলব, আমাদের সবার বঙ্গবন্ধুর বই দুটো পড়া উচিত। ছাড়া তিনি যেসব কথা বলতেন, যে বক্তৃতা দিয়েছেন, যে জীবন যাপন করেছেন, তা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। আজকের বহু সমস্যার সমাধান বঙ্গবন্ধুর লেখায়, কথায়, আদর্শের মধ্যে নিহিত রয়েছে। আমাদের শুধু বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনাটা গ্রহণ করতে পারতে হবে

কতগুলো উদাহরণ দেওয়া যায়

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই ৫০-এর দশকে। বঙ্গবন্ধু তাঁকে বললেন, ‘আওয়ামী লীগ বিরোধী পার্টি। তাকে কাজ করতে দেওয়া উচিত। বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র চলতে পারে না। আপনি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তা আমি জানি।খাজা সাহবে স্বীকার করে নিলেন, আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‌‘আওয়ামী লীগ বিরোধী দল, আপনি স্বীকার করে নিয়েছেন। কথা আমি খবরের কাগজে দিতে পারি কি না।খাজা সাহেব বললেন, ‘নিশ্চয়ই পারো।
বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র চলতে পারে না, এটা বঙ্গবন্ধুর উক্তি। বিরোধীদলকে কাজ করতে দেওয়া উচিত, এটা বঙ্গবন্ধুর উপলব্ধি। (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ২১৪)

বঙ্গবন্ধুর ‌‌‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীবইয়ের ১৩৪ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু নবাবজাদা লিয়াকত আলীর ইংরেজি বক্তৃতা উদ্ধৃত করেছেন। ১৯৫০ সালে লিয়াকত আলী মুসলিম লীগ কাউন্সিল সভায় ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমি সব সময় নিজেকে মুসলিম লীগের প্রধানমন্ত্রী মনে করি, অ্যাসমব্লির প্রধানমন্ত্রী মনে করি না।
বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘তিনি জনগণের প্রধানমন্ত্রী হতে চান নাই, একটা দলের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছেন। রাষ্ট্র রাজনৈতিক দল যে এক হতে পারে না, কথাও তিনি ভুলে গিয়েছিলেন।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ১৩৪)

বঙ্গবন্ধুকারাগারের রোজনামচাবইয়ের ১৮৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘যারা এই অত্যাচার করে তারা কিন্তু নিজ স্বার্থ বা গোষ্ঠীর স্বার্থের জন্যই করে থাকে। সকলেই তো জানে একদিন মরতে হবে। তবুও মানুষ অন্ধ হয়ে যায় স্বার্থের জন্য। হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। পরের ছেলেকে যখন হত্যা করে, নিজের ছেলের কথাটি মনে পড়ে না। মানুষ স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়।

‌‘পাকিস্তানের ১৯ বৎসরে যা দেখলাম তা ভাবতেও শিহরিয়া উঠতে হয়। যেই ক্ষমতায় আসে সেই মনে করে সে একলাই দেশের কথা চিন্তা করে, আর সকলেই রাষ্ট্রদ্রোহী, দেশদ্রোহী আরো কত কি। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কারাগারে বন্দী রেখে অনেক দেশনেতাকে শেষ করে দিয়েছে। তাদের স্বাস্থ্য নষ্ট করে দিয়েছে, সংসার ধ্বংস করে দিয়েছে। আর কতকাল এই অত্যাচার চলবে কেই বা জানে! এই তো স্বাধীনতা, এই তো মানবাধিকার!’

১৯৬৬ সালের ১০ জুনকারাগারের রোজনামচা বঙ্গবন্ধু লিখেছেন (পৃষ্ঠা ৭৯): দৈনিক খবরের কাগজ এল, দেখলাম কাগজগুলিকে সরকার সংবাদ সরবরাহ করা বন্ধ করে দিয়েছে। প্রায়ই প্যামফ্লেট করে রেখেছে। কোনো সংবাদই নাই আন্দোলনের।
জেলের কয়েদিদের খবর হলো, ‌হাজার লোকের উপর মারা গেছে পুলিশের গুলিতেএমন অনেক খবর রটেছে। সত্য খবর বন্ধ হলে অনেক আজগুবি খবর গ্রামে গ্রামে ছড়াইয়া পড়ে, এতে সরকারের অপকার ছাড়া উপকার হয় না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এইখানে লাখ কথার এক কথা বলেছেন। সত্য খবর বন্ধ হয়ে গেলে গুজব ছড়ায়। তাতে সরকারের আরও বেশি ক্ষতি হয়

১৫৪ পৃষ্ঠায় একই বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‌‘আমাদের পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তিনটা কাগজের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়েছে। একটা সংবাদ, পূর্ব পাকিস্তানের কাগজ, আর দুইটা নওয়াই ওয়াক্ত কোহিস্তানপশ্চিম পাকিস্তানের কাগজ। প্রায় সকল কাগজকেই সরকার ছলেবলে কৌশলে নিজের সমর্থক করে নিয়েছে। যে দুচারটা কাগজ এখনও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে জনগণের দাবিদাওয়া তুলে ধরছে তাদের শেষ করার পন্থা অবলম্বন করেছে সরকার।বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘দেশকে ধ্বংসের দিকে এরা নিয়ে চলেছে। ফলাফল ভয়াবহ হবে।

একজন প্রবক্তা, একজন নেতা, একজন দিশারি আজো হুশিয়ার করে যাচ্ছেন, আমরা শিখছি কি? আগামীতেও তিনি আমাদের পথ দেখিয়ে যাবেন। (প্রথম আলোর সৌজন্যে)