বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৮, ১৩ বৈশাখ ১৪২৫
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

রোহিঙ্গাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার

মো. জাকির হোসেন | আমারক্যাম্পাস২৪.কম

Published: 2017-09-30 17:18:43

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রতিটি জাতি ও গোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আছে। এই অধিকারের মূল কথা হলো, প্রতিটি জাতির নিজের ভাগ্য নিজেরই নির্ধারণ করার অধিকার রয়েছে।

প্রাচীনতম অধিকারগুলোর একটি আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ভিত্তিতেই কয়েক শ বছরের ঔপনিবেশিক বিশ্বব্যবস্থার বিলোপ সম্ভব হয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কারণেই অনেক জাতি-জনগোষ্ঠী স্বাধীনতা লাভ করে নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এমন একটি অধিকার, যার বলে কোনো জনগোষ্ঠী তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ ও স্বাধীনভাবে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার অনুশীলনের স্বীকৃত পন্থাগুলো হলো—এক. কোনো জনগোষ্ঠী কোনো রাষ্ট্র থেকে আলাদা হয়ে ওই রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে পৃথক স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করতে পারে। দুই. এক রাষ্ট্র থেকে পৃথক হয়ে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডসহ পছন্দের কোনো প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে। তিন. নিজ রাষ্ট্র থেকে আলাদা না হয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

একসময় ধারণা করা হতো, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার শুধু ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য। বিদেশি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হলে রাষ্ট্রীয় সীমানা হবে স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয়।

ফলে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এর প্রাসঙ্গিকতা হারাবে। রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিশ্চিত করতে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রয়োগ করা যাবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোভাব ছিল বিশ্বে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতাকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার পরিপন্থী কোনো রকম বিচ্ছিন্নতাবাদী পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। তাই আমরা দেখতে পাই, বিগত শতাব্দীর সত্তরের দশকের আগের পরিস্থিতিতে কাতাঙ্গা, বায়াফ্রা, সুদান, সাদ, ইথিওপিয়া, তিব্বত, কুর্দিস্তান অথবা ফরমোসা, এর কোনো ক্ষেত্রেই জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রয়োগকে আন্তর্জাতিক মহল স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু  সত্তরের দশকের পরের পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারণা ভুল প্রমাণিত করে ঔপনিবেশিক শাসন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ, তিমুর লেস্টে, বসনিয়া, স্লোবেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তান, কিরঘিজস্তান, আজারবাইজান, বেলারুশ, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কেমেনিস্তান, জর্জিয়া, ইউক্রেন, লিথুয়ানিয়া, দক্ষিণ সুদানসহ বেশ কিছু স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। অন্যদিকে পৃথিবীর নানা প্রান্তে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে।

আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত। জাতিসংঘ সনদের ১(২) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘জাতিসংঘের উদ্দেশ্য হলো : বিভিন্ন জাতির মধ্যে সম-অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণ নীতির ভিত্তিতে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের প্রসার ও বিশ্বশান্তি দৃঢ় করার জন্য অন্যান্য উপযুক্ত কর্মপন্থা গ্রহণ। ’ ১৯৬৬ সালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রণীত যমজ মানবাধিকার চুক্তি তথা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি ও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি, উভয় চুক্তির ১(১) অনুচ্ছেদে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘সব জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সে অধিকারবলে তারা অবাধে তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করে ও স্বাধীনভাবে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মপ্রয়াস অব্যাহত রাখবে। ’ ১(২) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, ‘...কোনোক্রমেই কোনো জনগোষ্ঠীকে তাদের জীবিকার উপায় থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। ’ এ তিনটি সর্বজনীন আন্তর্জাতিক চুক্তির পাশাপাশি ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা, ১৯৭০ সালের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক আইনের মূলনীতিবিষয়ক ঘোষণা, ১৯৭৫ সালের হেলসিংকি ফাইনাল অ্যাক্ট, মানবাধিকার ও গণ-অধিকারসংক্রান্ত আফ্রিকান চুক্তি ১৯৮১, চার্টার অব প্যারিস ১৯৯০ এবং ১৯৯৩ সালের ভিয়েনা ডিক্লারেশন অ্যান্ড প্রগ্রাম অব অ্যাকশনে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আদালতও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। নামিবিয়া মামলা, পশ্চিম সাহারা মামলা ও পূর্ব তিমুর মামলায় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে আন্তর্জাতিক আদালত erga omnes, অর্থাৎ জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি রাষ্ট্রগুলোর সম্মান প্রদর্শনের দায়িত্ব রয়েছে বলে তাঁর রায়ে উল্লেখ করেছেন।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার দাবির ক্ষেত্রে যে বিতর্কগুলো প্রায়ই সামনে নিয়ে আসা হয় তা হলো, যারা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার দাবি করছে, তারা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার দাবি করার যোগ্য জনগোষ্ঠী কি না এবং সেই জনগোষ্ঠীর দাবির বৈধতা কতখানি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলার সময় আন্তর্জাতিক জুরিস্ট কমিশন আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার দাবি করার যোগ্য জনগোষ্ঠীর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছে। এক. কোনো জনগোষ্ঠীর সাধারণ ইতিহাস; দুই. তাদের মধ্যে জাতিগত ও নৃতাত্ত্বিক বন্ধন; তিন. সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বন্ধন; চার. ধর্মীয় ও আদর্শিক বন্ধন; পাঁচ. একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা ভৌগোলিক এলাকায় তাদের বসতি; ছয়. জনগোষ্ঠীর একটি সাধারণ বা যৌথ অর্থনৈতিক অবলম্বন বা ভিত্তি এবং সাত. জনগোষ্ঠীর পর্যাপ্ত সংখ্যক সদস্য থাকা।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের একটি সাধারণ ইতিহাস রয়েছে। অষ্টম শতাব্দীতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। প্রাথমিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যীয় মুসলমান ও স্থানীয় আরাকানিদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। পরে রাখাইন, আরাকানি, বার্মিজ, বাঙালি, ভারতীয়, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষদের মিশ্রণে উদ্ভূত এই সংকর জাতি ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে দৃঢ় জাতিগত বন্ধন লক্ষণীয়। রোহিঙ্গারা আরাকানে একটি সুস্পষ্ট জাতি হিসেবে বিকশিত হয়েছে। তাদের সংস্কৃতি অভিন্ন ও ভাষা অন্য বার্মিজদের থেকে আলাদা। স্কটিশ ডাক্তার ও পরে ভূগোলবিদ খ্যাত Francis Buchanan-Hamilton কর্তৃক 1799 সালে প্রকাশিত A Comparative Vocabulary of Some of the Languages Spoken in the Burma Empire শিরোনামের প্রবন্ধে উল্লেখ করেন যে বহুকাল আগে থেকে আরাকানে বসতি স্থাপনকারী মুসলমানরা নিজেদের আরাকানের আদিবাসী ও রুনিগা বলে পরিচয় দিত। তাদের উপভাষা তথা স্থানীয় ভাষা অন্যদের থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল। রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় ও আদর্শিক যৌথ বন্ধন হলো ইসলাম ধর্ম। মিয়ানমারের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় রোহিঙ্গাদের বসবাস। তাদের সাধারণ অর্থনৈতিক অবলম্বন বা ভিত্তি হলো কৃষি। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের দীর্ঘ নিপীড়ন-নৃশংসতার ফলে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য মিয়ানমার ছেড়ে অন্য রাষ্ট্রে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। আরাকান ও অন্যান্য দেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা ৩০ লাখ বলে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে কয়েকজন নিয়ে রাষ্ট্র গঠনসহ ১৩০ কোটি মানুষের রাষ্ট্রও রয়েছে। সেই বিবেচনায় ৩০ লাখ মানুষ পর্যাপ্ত বলেই প্রতীয়মান হয়। ফলে রোহিঙ্গারা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক আইনে জনগোষ্ঠীর শর্ত পূরণ করে।

সমকালীন আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক ব্যবস্থায় কোনো জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রয়োগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো এ ধরনের দাবির বৈধতা নির্ণয়। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রয়োগের বৈধতা নিরূপণের প্রধান মাপকাঠি হলো কোনো জাতি-গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা ও এর তীব্রতা এবং ওই জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। ফলে ঔপনিবেশিক শাসন-পরবর্তী বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কোনো জনগোষ্ঠী যেসব কারণে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার দাবি করতে পারে তা হলো, এক. জাতিগত নিধন; দুই. গণহত্যা; তিন. জাতিগত বৈষম্য বা মূল স্রোত থেকে কোনো জনগোষ্ঠীকে জোর-জবরদস্তি পৃথক করা এবং চার. কোনো জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র সত্তা সংরক্ষণ অস্বীকার করা। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে রোহিঙ্গারা ধারাবাহিকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন, জাতিগত নিধন, গণহত্যা ও চরম বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। অন্যদিকে মিয়ানমার সরকার নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র সত্তাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের জান্তা সরকার নতুন নাগরিকত্ব আইন প্রণয়ন করে। এ আইন কার্যকর হওয়ার পর ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই যে নাগরিকত্ব আইন তৈরি করেছিল তা বাতিল হয়ে যায়। আর সেই সঙ্গে বাতিল হয়ে যায় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব। মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারও অচল হয়ে যায়। রোহিঙ্গাদের বঞ্চনা, নিপীড়ন ও শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয় নতুন নাগরিকত্ব আইন। ১৯৪৮ সালের নাগরিকত্ব আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর পাশাপাশি রোহিঙ্গারাও আরাকানিজ মুসলিম নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত ছিল। সামরিক জান্তার আগের নির্বাচিত সরকার যেখানে ১৪৪টি জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল, সেখানে জান্তা সরকার মুসলিম আরাকানিজ, চায়নিজ মুসলিম, মালয়া মুসলিমসহ ৯টি জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের মিয়ানমারের জাতিগোষ্ঠীর তালিকা থেকে বাদ দিয়ে তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দেয়। নাগরিকত্ব বঞ্চিত রোহিঙ্গারা এখন পদে পদে ভয়ংকর স্বেচ্ছাচারিতা ও বৈষম্যের শিকার। হত্যা, ধর্ষণ, যখন-তখন সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া, জবরদস্তি শ্রমে নিয়োগ, বৈষম্যমূলক করারোপ, চলাচলের স্বাধীনতা হরণ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিদেশে যেতে যেমন ভিসা লাগে, তেমনি রোহিঙ্গাদের এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যেতে পাস (অনুমতিপত্র) লাগে। পাসে উল্লিখিত নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় গ্রামের বাইরে অবস্থান করলে মিয়ানমার প্রশাসন পরিবারের সদস্য তালিকা থেকে তার নাম কেটে দেয় এবং তাকে মিয়ানমার ত্যাগে বাধ্য করে। স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ না থাকায় শিক্ষা, চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা, এমনকি বাজারে যাওয়ার স্বাধীনতাও রোহিঙ্গাদের নাগালের বাইরে। পাস ছাড়া এমনকি তারা স্কুল-কলেজেও যেতে পারে না। ফলে শিক্ষার্থীদের মূলত দূরশিক্ষণের ওপর নির্ভর করতে হয়। অন্যদিকে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা হ্রাস করার কৌশল হিসেবে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য বিবাহ নিয়ন্ত্রণ আইন চালু করেছে। কোনো রোহিঙ্গা বিয়ে করতে চাইলে শহর বা গ্রাম প্রশাসন, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকার সংশ্লিষ্ট সেক্টর কমান্ডার ও সংশ্লিষ্ট সামরিক প্রশাসন থেকে অনুমতি নিতে হবে। এ ধরনের অনুমতির জন্য ফি সহকারে আবেদন করতে হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘ কালক্ষেপণ করা হয়। অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে শাস্তি ১০ বছরের কারাদণ্ড। Chris Lewa তাঁর North Arakan : An Open Prison for the Rohingya in Burma প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, বিয়ে নিয়ন্ত্রণ আইন নারীদের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। অনুমতি ছাড়া গোপনে বিয়ে করে গর্ভবতী হয়ে পড়লে শাস্তির ভয়ে তাকে অবৈধ পন্থায় অনভিজ্ঞ বৈদ্যের কাছে গর্ভপাত করাতে হয়, যা নারীদের জীবন হুমকির মুখে ফেলেছে। অনুমতি ছাড়া বিয়ে হওয়া দম্পতি অনেক সময় তাদের সন্তানকে অনুমতিপ্রাপ্ত দম্পতির সন্তান হিসেবে জন্ম নিবন্ধন করে। এমনকি কেউ কেউ নিজের সন্তানকে তার নিজ মা-বাবার সন্তান হিসেবে অর্থাৎ দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানিকে মা-বাবা হিসেবে দেখিয়ে সন্তানের জন্ম নিবন্ধন করে থাকে। বৈষম্যমূলক কর আইনে রোহিঙ্গাদের পরিবারে কারো জন্ম হলেও কর দিতে হয়, মৃত্যু হলেও কর দিতে হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির পরিদর্শনকারী ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি প্রতিনিধিদল রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত অপরাধকে গণহত্যা বলে অভিহিত করেছে। মার্কিন জেনোসাইড বিশেষজ্ঞ ড. গ্রেগরি এইচ স্ট্যানটন বলেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও আরাকান মিলিশিয়ারা বহু বছর ধরে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আরাকানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যা চলছে, তাকে বর্ণনা করতে ২০১২ সালেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জেনোসাইড ওয়াচের পক্ষ থেকে প্রথম ‘জেনোসাইড’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলারসের সাবেক প্রেসিডেন্ট আর্জেন্টিনার দানিয়েল ফিয়েরেস্তেইন, মালয়েশিয়ার জুলাইহা ইসমাইল, কম্বোডিয়ার আইনবিদ হেলেন জার্ভিস, অস্ট্রেলিয়ার সিডনির মেকুইয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক প্রধান জিল এইচ বোয়েরিঙ্গার, ইন্দোনেশিয়ার মানবাধিকার আইনজীবী নুরসিয়াবানি কাতজাসুংকানা, ইরানের মানবাধিকার আইনজীবী সাদি সদর ও ইতালির সুপ্রিম কোর্ট অব ক্যাসেসনের বর্তমান সলিসিটর জেনারেল নিলো রেসিকে নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক গণ-আদালত প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি, বিভিন্ন প্রামাণ্য দলিল ও সাক্ষ্যগ্রহণের ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর দায়ে রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গণহত্যা বলতে আন্তর্জাতিক আইনে এমন কর্মকাণ্ড বোঝানো হয়েছে, যার মাধ্যমে একটি জাতি বা ধর্মীয় সম্প্রদায় বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সরকারের ধারাবাহিক নিপীড়ন, নৃশংসতা ও গণহত্যা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রয়োগের ন্যায্যতা প্রতিপন্ন করে।

ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী দিক থেকে মিয়ানমারের বৌদ্ধরা চলমান সেনা অভিযানের পক্ষে ও কট্টর রোহিঙ্গাবিরোধী। মিয়ানমারের লোকজনের প্রচলিত ধারণা, রোহিঙ্গারা দেশটির নাগরিক নয়। মিয়ানমারের ৯০ শতাংশ মানুষ বৌদ্ধ। তবে সেখানকার মুসলমানরা বৌদ্ধদের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে—এমন ধারণা বেশ প্রতিষ্ঠিত। দিন দিন এ ধারণা বৌদ্ধদের মধ্যে আরো পোক্ত হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হতাশাগ্রস্ত বৌদ্ধরা মনে করে ইসলাম ধর্ম ক্ষতিকর। ফলে অন্য ধর্মের মানুষের উপস্থিতি মেনে নেওয়ায় তাদের (বৌদ্ধ) ধর্মবিশ্বাস দুর্বল হচ্ছে। মিয়ানমারের বেশির ভাগ মানুষ তাই রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নকে কোনো ভুল মনে করে না।

এমন একটি আস্থাহীনতার পরিবেশে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন ও তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করলেই রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে বলে প্রতীয়মান হয় না। যেকোনো আকৃতি বা প্রকৃতিতে রোহিঙ্গাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করা স্থায়ী সমাধানের পথ হতে পারে।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

zhossain@justice.com