ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি (DCU) বিল ২০২৬ সংসদে পাস


রাজধানীর সাত কলেজের স্বাতন্ত্র্য ও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে প্রণীত ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি (DCU) আইন, ২০২৬’ বিল ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিনে পাস হয়েছে।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। উত্থাপনের পর দফাওয়ারি কোনো সংশোধনী প্রস্তাব না থাকায় বিলটি কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।

বিলে উল্লেখ করা হয়েছে, আধুনিক ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর মাধ্যমে ঢাকা মহানগরের সাতটি কলেজকে কেন্দ্র করে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। পাশাপাশি মানসম্মত পাঠ্যক্রম, শিক্ষাদান, সনদ প্রদানসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে।

এই সাতটি কলেজ হলো— ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ এবং কবি নজরুল সরকারি কলেজ। কেন্দ্রীয়ভাবে মূল ক্যাম্পাসেও অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু থাকবে।

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি (DCU) বিল

বিলের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি (DCU) মূল ক্যাম্পাসের পাশাপাশি সংযুক্ত কলেজগুলোতেও অনার্স ও মাস্টার্স কার্যক্রম চলমান থাকবে।

এতে বলা হয়েছে, সংযুক্ত কলেজগুলোর প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে অধ্যক্ষ দায়িত্ব পালন করবেন। একাডেমিক বিভাগগুলোর সমন্বয়ের জন্য থাকবেন ‘উচ্চ শিক্ষা কো-অর্ডিনেটর’। এছাড়া সংযুক্ত কলেজের অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষকদের ‘কলেজ শিক্ষক’ হিসেবে অভিহিত করা হবে।

বিলে ‘স্কুল’ শব্দটি প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুষদের বিকল্প কাঠামো হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে স্কুল বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের সমন্বয়ে গঠিত একটি কাঠামোকে বোঝানো হয়েছে। অনুষদের ক্ষেত্রে যেমন ডিন থাকেন, তেমনি স্কুলে থাকবেন ‘হেড অব স্কুল’। এছাড়া প্রতিটি স্কুলের অধীনে ডিসিপ্লিনভিত্তিক চেয়ারম্যানও থাকবেন, যা উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোর অনুরূপ।

স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়টি অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক গঠিত ভর্তি কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হবে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী কার্যকর হবে।

অ্যাকাডেমিক ইউনিট সংক্রান্ত বিধানে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, আইন, চারুকলা এবং বিধি দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য ‘স্কুল’ থাকবে। প্রয়োজনে বিদ্যমান কোনো স্কুল বা একাধিক স্কুল বিভাজন, একত্রীকরণ, নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা কিংবা অন্য যেকোনো উপায়ে অতিরিক্ত স্কুল গঠন করা যাবে। প্রতিটি স্কুল অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাঠদান, পাঠ্যক্রম পরিচালনা এবং গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

DCU তে শিক্ষার্থী ভর্তি

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল, ভর্তি পরীক্ষার নম্বর এবং শিক্ষার্থীদের পছন্দক্রমের ভিত্তিতে মেধাতালিকা অনুসারে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস বা সংযুক্ত সাতটি কলেজের বিভিন্ন স্কুল বা ডিসিপ্লিনে ভর্তির সুযোগ পাবে।

বিলে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের কোনো অনুমোদিত শিক্ষা বোর্ড বা সমমানের সংস্থার অধীন স্বীকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে, কিংবা বিদেশের কোনো অনুমোদিত ও স্বীকৃত শিক্ষা বোর্ড, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের অধীনে সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালায় নির্ধারিত অন্যান্য যোগ্যতা পূরণ করতে ব্যর্থ হলে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী স্নাতক পর্যায়ের কোনো কোর্সে ভর্তির জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।

আরও পড়ুন: ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি (DCU) এর অনুষদ ও বিষয় সমূহ

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্সে ভর্তির শর্তাবলি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে। পাশাপাশি, ভর্তির উদ্দেশ্যে অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা স্বীকৃত সংস্থার প্রদত্ত ডিগ্রিকে বিধিমালা অনুযায়ী সমমান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। একইভাবে, স্বীকৃত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা বোর্ডের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার বাইরে অন্য কোনো পরীক্ষাকেও প্রয়োজন অনুযায়ী উচ্চমাধ্যমিকের সমমান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কারণ

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরের সরকারি সাতটি কলেজ— ঢাকা কলেজ, বেগম বদরুন্নেছা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ এবং সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ— ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে সেশনজট, পরীক্ষার বিলম্ব এবং প্রশাসনিক জটিলতার মতো সমস্যার কারণে ২০১৭ সালে এসব কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তির পরও প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে বিভিন্ন জটিলতা আরও বাড়তে থাকে। সেশনজট, শিক্ষক সংকট এবং শ্রেণিকক্ষের অভাবসহ নানা সমস্যার কথা উল্লেখ করে শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি বাতিল করে পৃথক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সাত কলেজ পরিচালনার দাবি জানায়। এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় করে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করে, যা ২০২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।

উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বমানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা, জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষা ও গবেষণার প্রসার, আধুনিক জ্ঞানচর্চা এবং পঠন-পাঠনের সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠাকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও যৌক্তিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংযুক্ত কলেজ সম্পর্কিত সাধারণ বিধান

সংযুক্ত কলেজগুলোকে সর্বসাধারণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হবে। প্রতিটি কলেজের অধ্যক্ষ অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকবেন। কলেজে নির্ধারিত শিক্ষার্থী বেতন ও অন্যান্য ফি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

প্রত্যেক সংযুক্ত কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধি, বিধি ও প্রবিধান মেনে চলতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত টার্ম, অবকাশ ও ছুটির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

এছাড়া, প্রতিটি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় রেজিস্টার ও নথিপত্র সংরক্ষণ করতে হবে এবং সময়ে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য সরবরাহ করতে হবে। প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে পূর্ববর্তী শিক্ষাবর্ষের কার্যক্রমের বিস্তারিত প্রতিবেদন উপাচার্যের কাছে জমা দিতে হবে, যেখানে শিক্ষা কার্যক্রম, ব্যবস্থাপনা, পরিবর্তনের বিবরণ, শিক্ষার্থী সংখ্যা, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে।