২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বিকেল ৩টায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ বাজেট উপস্থাপন করবেন।
এটি নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট এবং আকারের দিক থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা খাতের জন্য রেকর্ড ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই বরাদ্দের মাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সামাজিক সুরক্ষা জোরদার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বিস্তার এবং চলমান শিক্ষা সংস্কার কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যের প্রতিফলন দেখা গেছে।
জাতীয়করণ ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ বরাদ্দ
বাজেটে সদ্য জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বকেয়া পাওনা ধাপে ধাপে পরিশোধের জন্য ৪৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের সামাজিক সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগ
প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস ও স্কুল ব্যাগ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত শিক্ষার্থীদের সহায়তায় ২৫০ কোটি টাকার পৃথক প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
শিক্ষা খাতে নতুন সংযোজন হিসেবে বুলিং প্রতিরোধে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এবং শিক্ষকদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ক প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।
উপবৃত্তি ও বৃত্তি কার্যক্রমে বাড়তি গুরুত্ব
মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমিয়ে আনা এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার লক্ষ্যে সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইডিপি)-এর আওতায় উপবৃত্তি খাতে ২ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া সাধারণ বৃত্তি ও মেধাবৃত্তির জন্য অতিরিক্ত ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
পাঠ্যপুস্তক, বিদ্যালয় উন্নয়ন ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ
বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও বিতরণ কার্যক্রমের জন্য ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে ২ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা, সরকারি কলেজগুলোতে বিজ্ঞান শিক্ষা সম্প্রসারণে ৩৮৬ কোটি টাকা এবং মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ‘লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন (লেইস)’ প্রকল্পে ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
শিক্ষা সংস্কার ও স্টেমভিত্তিক স্কুল গঠন
কারিকুলাম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির উন্নয়ন এবং শিক্ষা সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এছাড়া জেলা সদরের বড় সরকারি বালক ও বালিকা বিদ্যালয়গুলোকে আধুনিক স্টেম (STEM) ভিত্তিক মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে রূপান্তরের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
চালু হচ্ছে জাতীয় শিক্ষা টিভি চ্যানেল
প্রান্তিক ও তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছে দেশের সেরা শিক্ষকদের পাঠদান পৌঁছে দিতে প্রথমবারের মতো জাতীয় শিক্ষা টিভি চ্যানেল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে দেশের সব বিদ্যালয়ে গ্রিন অ্যান্ড রিনিউঅ্যাবল এনার্জি এবং রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। বৃহৎ জেলা শহরগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য গণপরিবহনভিত্তিক যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের নিরাপদ শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে মাধ্যমিক পর্যায়ের ৫১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।
এছাড়া ১ লাখ ১৮ হাজার ৯৮০ শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন, কাউন্সেলিং এবং বুলিং প্রতিরোধ বিষয়ে শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
এআই প্রশিক্ষণ, স্মার্ট ক্লাসরুম ও ফ্রি ওয়াই-ফাই
শিক্ষকদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং জলবায়ু সংশ্লিষ্ট অনুদানের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এছাড়া দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সম্পূর্ণ ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধার আওতায় আনা এবং স্মার্ট ক্লাসরুম নির্মাণে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য পৃথক বরাদ্দের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
পরিবেশ ও জলবায়ু সচেতনতায় বিশেষ কর্মসূচি
মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ৫ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই অর্থ দিয়ে একটি ফলদ ও একটি বনজ গাছ রোপণ, জলবায়ু বিষয়ক দেয়ালিকা প্রকাশ এবং বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হবে।
এছাড়া জলবায়ু বিষয়ক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার আওতায় ১১ হাজার শিক্ষক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন।
স্নাতক ও স্নাতকোত্তরদের জন্য শিক্ষানবিশ ভাতা
উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের সহায়তায় প্রথমবারের মতো শিক্ষানবিশ ভাতা চালুর লক্ষ্যে একটি পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের জন্য এই কর্মসূচিতে ২২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষা খাতে রেকর্ড এই বরাদ্দ দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।