প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যুক্ত হচ্ছে স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ


পিঠে ভারী স্কুলব্যাগ আর চার দেয়ালের গুমোট পরিবেশে মুখস্থ বিদ্যার চেনা ছকটি এবার পুরোপুরি বদলে যাচ্ছে। কোমলমতি শিশুদের শৈশবের শুরুতেই স্কুলভীতি দূর করতে এবং খেলার ছলে শিক্ষার ভিত মজবুত করতে এক যুগান্তকারী মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। দেশের প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষগুলোকে রূপ দেওয়া হচ্ছে এক একটি জাদুকরী রূপকথার জগতে।

এই লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই ৩৪২ কোটি ৬১ লাখ ৬১ হাজার টাকার একটি মেগা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘এএসডি কনসালটেন্সি সার্ভিস’ এই সমীক্ষা প্রতিবেদনটি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কাছে জমা দিয়েছে। ২০২৫ সালের বাজারদর অনুযায়ী প্রণয়ন করা এই বাজেটের প্রায় ৮৫ দশমিক ২৪ শতাংশ অর্থই ব্যয় হবে শ্রেণিকক্ষ সজ্জার মূলধন কাজে।

পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে দেশের ৫১২টি উপজেলার ৮ হাজার ২১৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গড়ে তোলা হবে আধুনিক ও শিশুতোষ স্মার্ট ক্লাসরুম, যেখানে ঐতিহ্যবাহী চক-ডাস্টারের জায়গা দখল করবে আধুনিক স্মার্ট টিভি আর আকর্ষণীয় ই-লার্নিং সরঞ্জাম। ৪ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিদ্যালয়কে আকর্ষণীয় করে তোলার মাধ্যমে ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

বৈজ্ঞানিক লার্নিং কর্নার ও আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া

পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদিত ফরম্যাট অনুযায়ী তৈরি এই প্রতিবেদনে প্রাক-প্রাথমিকের শ্রেণিকক্ষগুলোকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশেষ চারটি লার্নিং কর্নারে ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রথমটি হলো কল্পনা কোণ, যেখানে শিশুরা নিজেদের সৃজনশীল চিন্তা প্রকাশ ও অভিনয়ের সুযোগ পাবে। দ্বিতীয়টি ব্লক ও নাড়াচাড়া কোণ, যা সাজানো থাকবে বিভিন্ন গঠনমূলক খেলার সরঞ্জাম দিয়ে।

তৃতীয়টি বালি ও পানি কোণ, যেখানে প্রকৃতির এই দুই উপাদানের মাধ্যমে শিশুরা পাবে হাতে-কলমে শেখার বাস্তব অভিজ্ঞতা। আর চতুর্থটি হলো বই ও অঙ্কন কোণ, যা নির্ধারিত থাকবে শিশুদের ছবি দেখা ও ছবি আঁকার জন্য। আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে প্রতিটি কক্ষে একটি করে স্মার্ট টিভি স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে শিক্ষামূলক কার্টুন, অ্যানিমেশন এবং জাতীয় পর্যায়ের শিশুতোষ অনুষ্ঠান প্রদর্শন করা হবে।

এতে জটিল বিষয়গুলো শিশুদের কাছে সহজবোধ্য হবে এবং তারা দ্রুত শিখতে পারবে। লার্নিং কর্নার ও প্রযুক্তির এই মিশেলে শ্রেণিকক্ষগুলো একেকটি আধুনিক ই-লার্নিং সেন্টারে পরিণত হবে। এছাড়া দীর্ঘক্ষণ ক্লাসে থাকার ক্লান্তি দূর করতে শিশুদের জন্য শ্রেণিকক্ষেই থাকছে আরামদায়ক বিশ্রামের ব্যবস্থা। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না এবং নতুন করে কোনো ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না বলেও সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষায় বিপ্লব ও সবুজ পাতার ১৩টি মেগা প্রকল্প

দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈপ্লবিক ও স্মার্ট রূপ দিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় মোট ১৩টি বড় উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অননুমোদিত এই নতুন প্রকল্পগুলো এরইমধ্যে সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচির সবুজ পাতায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই ১৩টি মেগা প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম প্রধান এবং আকর্ষণীয় উদ্যোগ হলো এই নির্বাচিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষ আকর্ষণীয়ভাবে সজ্জিতকরণ প্রকল্প। তবে এর পাশাপাশি আরও ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।

সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্প, বিদ্যমান মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১১টি সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচিত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, জরাজীর্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ উন্নয়ন প্রকল্প এবং বহুল প্রতীক্ষিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মিড ডে মিল প্রকল্প যা দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে।

এছাড়া তালিকায় রয়েছে নেক্সটজেন প্রাইমারি এডুকেশন প্রোগ্রাম, পার্বত্য জেলাগুলোর বিদ্যুৎবিহীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সৌরবিদ্যুতায়ন প্রকল্প, ঢাকা মহানগরীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, সারাদেশের সব পিটিআইয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং ইউনিয়ন মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্প।

সারাদেশের ৮টি বিভাগের ৬৪টি জেলাতেই এই প্রকল্পের মডেল বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক তালিকায় ৫০৫টি সরকারি মডেল স্কুল, পিপিটিআই সংলগ্ন ৬৫টি পরীক্ষামূলক স্কুল এবং দেশের সেরা নির্বাচিত কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এবং সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্তের আলোকে এখন একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করা হচ্ছে। এরপর তা পরিকল্পনা কমিশন এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় উপস্থাপনের পর সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন ও বাজেট বরাদ্দ মিললেই কেবল মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হতে পারবে। অনুমোদন পাওয়ার পর আগামী ৩৬ মাসের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে বলে প্রতিবেদনে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষাকে আনন্দময় করতে প্রতিমন্ত্রীর অঙ্গীকার

দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও ভয়মুক্ত, আনন্দময় ও শিশুবান্ধব করে তোলার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বহুমুখী ও দূরদর্শী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি জানান যে, প্রাথমিক শিক্ষাকে আনন্দময় ও শিশুবান্ধব করে তুলতে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে এবং মূল লক্ষ্যই হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের জন্য বিদ্যালয়কে একটি আকর্ষণীয় ও ভালোবাসার জায়গা হিসেবে গড়ে তোলা।

দেশের শিশুদের প্রথাবদ্ধ শিক্ষার যে একঘেয়েমি ও ভীতি রয়েছে, তা দূর করতে শ্রেণিকক্ষে একটি আধুনিক, চাক্ষুষ ও বিজ্ঞানসম্মত পরিবেশ গড়ে তোলা এই মুহূর্তে সময়ের দাবি ছিল বলে তিনি মনে করেন। প্রাক-প্রাথমিক স্তরেই যদি শিশুদের শিক্ষার বুনিয়াদকে প্রযুক্তিভিত্তিক ও রঙিন করা যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনেক বেশি দক্ষ, চিন্তাশীল ও সৃজনশীল হয়ে উঠবে।

বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়ে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন যে, সরকার যে মহাপরিকল্পনাগুলো হাতে নিচ্ছে, তার মূল সুফল যেন দেশের প্রতিটি প্রান্তিক অঞ্চলের শিশু পায় তা নিশ্চিত করা হবে। এই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন যেন শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে এবং কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়া একদম তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছায়, সরকার তা কঠোরভাবে মনিটরিং করবে।