ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতিতে একগুচ্ছ বড় ধরনের সংস্কার ও কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। বিভিন্ন অনুষদের ডিনদের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবগুলো করা হয়েছে, যার মধ্যে লিখিত অংশ পুরোপুরি বাদ দিয়ে কেবল বহুনির্বাচনী বা এমসিকিউ (MCQ) পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি বেশ জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। একই সাথে বেশ কিছু বিভাগে আসন সংখ্যা কমিয়ে আনার চিন্তাভাবনাও করছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ডিনদের এসব প্রস্তাবনা একেবারেই প্রাথমিক আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ডিনস কমিটির একটি সভায় এই প্রাথমিক আলোচনা হয়। এসব প্রস্তাবের ওপর আরও গভীর পর্যালোচনা ও কাটাছেঁড়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ফোরামে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আগামী ঈদুল ফিতরের ছুটির পর নীতি-নির্ধারকরা এই বিষয়গুলো নিয়ে আবার বৈঠকে বসবেন।
ঢাবি ভর্তি পরীক্ষা এর লিখিত পরীক্ষা বাতিল ও প্রশ্ন কাঠামো নিয়ে আলোচনা
সভায় উপস্থিত একাধিক ডিন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতিকে আরও কীভাবে যুগোপযোগী ও ত্রুটিমুক্ত করা যায়, তা নিয়েই প্রাথমিক এই মতবিনিময়। সভায় অনেক ডিন লিখিত পরীক্ষা তুলে দেওয়ার পক্ষে মত দিলেও, কেউ কেউ আবার ভিন্ন সময়ে এমসিকিউ ও লিখিত পরীক্ষা আলাদাভাবে নেওয়ার প্রস্তাব করেন। পরীক্ষা পদ্ধতিকে আরও নিখুঁত করতে আরও চিন্তাভাবনা করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে বিজ্ঞান অনুষদের ডিন পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন বিষয় দুটিকে বাধ্যতামূলক রেখে অতিরিক্ত আরও চারটি বিষয়ের ওপর পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। একই সাথে তিনি সম্পূর্ণ এমসিকিউভিত্তিক পরীক্ষা নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন এবং প্রশ্নপত্রের কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন। তার এই এমসিকিউ পদ্ধতির প্রস্তাবের সাথে একমত পোষণ করেছেন বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিসহ বেশ কয়েকটি অনুষদের ডিন। অন্যদিকে, জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিনের পক্ষ থেকে ভর্তি পরীক্ষা ঢাকার বাইরে না নিয়ে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই আয়োজন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া অন্যান্য অনুষদের ডিন এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালকও ভর্তি পরীক্ষার সার্বিক পদ্ধতি ও পাসের হার নিয়ে নিজ নিজ মতামত তুলে ধরেন।
ভর্তি পরীক্ষাইয় ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ প্রস্তাব
একটি অনুষদের ডিন সংবাদমাধ্যমকে জানান, বিদ্যমান পরীক্ষা ব্যবস্থার কারণে ইংলিশ মিডিয়াম, ও-লেভেল এবং এ-লেভেলের শিক্ষার্থীরা এক ধরনের পিছিয়ে পড়ছেন এবং এর ফলে তাদের একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এই শিক্ষার্থীরা যাতে ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারেন, সেজন্য তাদের উপযোগী আলাদা প্রশ্নপত্র তৈরি করার একটি চিন্তাভাবনা চলছে। যেহেতু তারা ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করেছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই বাংলার বিষয়গুলোতে তাদের পক্ষে ভালো করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আসন হ্রাস ও শূন্য আসন পূরণের সংকট
ভর্তি পরীক্ষায় পরিবর্তনের পাশাপাশি বেশ কিছু বিভাগের আসন সংখ্যা কমানোর বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে আলোচনায় এসেছে। বেশ কয়েকটি বিষয়ে প্রতি বছরই শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় আসন শূন্য থেকে যাচ্ছে। এমনকি বিজ্ঞান অনুষদের চাহিদার শীর্ষে থাকা কিছু বিষয়েও প্রয়োজনীয় সংখ্যক উপযুক্ত বা যোগ্য শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়ার পরেও প্রতি বছর অনেক আসন ফাঁকা থেকে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: চতুর্থ, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে তিনটি নতুন বিষয়
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে কম চাহিদাসম্পন্ন কিছু বিষয়ের আসন সংখ্যা কমিয়ে আনার চিন্তা করা হচ্ছে। একই সাথে ফাঁকা আসনগুলো পূরণ করতে মেধাতালিকার অপেক্ষমাণ (ওয়েটিং লিস্ট) তালিকা থেকে শিক্ষার্থীদের ডেকে এনে শূন্য আসন পূরণের একটি প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, গত শিক্ষাবর্ষেও ঢাবিতে আসন সংখ্যা কমানো হয়েছিল, এবারও সেই ধারা বজায় রাখার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে
ভর্তি পরীক্ষার এই সম্ভাব্য পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন,
“ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে কিছু প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে মাত্র। এখন এই বিষয়ে বিভিন্ন বিভাগের মতামত নেওয়া হবে। বিভাগগুলোর মতামত পাওয়ার পর ডিনস কমিটিতে আলোচনা হবে এবং সেখান থেকে প্রস্তাব যাবে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে। সেখানে অনুমোদনের পর ভর্তি কমিটিতে বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ পাবে। তাই শেষ পর্যন্ত কী ধরনের পরিবর্তন আসছে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে এখনো লম্বা সময় বাকি।”
অনুরূপ বক্তব্য দিয়েছেন কলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক আবুল কালাম সরকার। তিনি জানান, মূলত ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতিগত কিছু সংস্কার নিয়ে প্রাথমিক কথাবার্তা হয়েছে। ঈদুল ফিতরের ছুটির পর হয়তো এই বিষয়গুলো নিয়ে নীতি-নির্ধারকরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে এগোবেন।