সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেল এর সুপারিশ আগামীকাল চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে নতুন এই বেতন কাঠামো তিন ধাপে বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করেছে সরকার। এই লক্ষ্য অর্জনে আগামী জাতীয় বাজেটে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুসারে, প্রথম দুই অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ধাপে ধাপে সমন্বয় করা হবে। আর তৃতীয় বছরে গিয়ে যুক্ত হবে বর্ধিত ভাতা, আনুষঙ্গিক অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক লাভ।
আগামীকাল চূড়ান্ত হচ্ছে পে স্কেল সুপারিশ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত কমিটি আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২১ মে) এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত সুপারিশমালা প্রস্তুত করতে যাচ্ছে। ইতিমিধ্যেই এই কমিটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও আর্থিক সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছ থেকে প্রাপ্ত মতামত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেছে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই তা দ্রুত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত পাওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে, যার মাধ্যমে নবম জাতীয় পে স্কেল কার্যকরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে।
তিন ধাপে পে স্কেল বাস্তবায়ন
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন এই পে স্কেলের প্রথম ধাপ কার্যকর করার প্রস্তুতি চলছে।
প্রথম ধাপ (১ জুলাই): এই ধাপে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের বিদ্যমান মূল বেতনের ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ সমন্বিত বেতন পাবেন।
দ্বিতীয় ধাপ: পরবর্তী অর্থবছরে মূল বেতনের বাকি সমপরিমাণ সমন্বয় যুক্ত করা হবে। তবে এই দুই বছর পর্যন্ত বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, ঝুঁকি ভাতা, বিশেষ প্রণোদনা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আগের কাঠামো অনুযায়ী বহাল থাকবে।
তৃতীয় ধাপ: দুই বছরের মধ্যে মূল বেতনের পূর্ণ সমন্বয় শেষ হওয়ার পর, অতিরিক্ত সব ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধা ২০২৮-২৯ অর্থবছরে একযোগে কার্যকর করা হতে পারে।
২০টি গ্রেড বহাল, বেতন বাড়ছে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন স্তরে
নতুন পে স্কেলেও সরকারি চাকরির বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে বেতন কাঠামোতে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে:
সর্বনিম্ন গ্রেড: মূল বেতন বর্তমানের ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সর্বোচ্চ গ্রেড: মূল বেতন বর্তমানের ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি হওয়ায়, নতুন স্কেলে তাদের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সাথে বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য কমিয়ে আনার প্রস্তাবও রাখা হতে পারে।
আরও পড়ুন: এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বদলির নীতিমালা জারি
যারা থাকছেন নবম পে স্কেলের আওতায়
নবম পে স্কেলের আওতায় প্রশাসন ক্যাডারের পাশাপাশি শিক্ষক, পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ প্রশাসন ও বিচার বিভাগীয় কর্মচারীসহ সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এর পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্যও সমন্বিত নির্দেশনা থাকতে পারে। তবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে সুপারিশ অনুমোদনের পর।
পেনশনভোগীদের সুবিধা বাড়ানোর বড় প্রস্তাব
নতুন পে স্কেলের পাশাপাশি পেনশনভোগীদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর বিষয়েও বিশেষ সুপারিশ করা হয়েছে। সাবেক সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশন পেনশনের হার সর্বোচ্চ শতভাগ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
প্রস্তাবিত সুপারিশগুলো হলো:
২০ হাজার টাকার কম পেনশনধারী: যাদের মাসিক পেনশন ২০ হাজার টাকার কম, তাদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশনধারী: এই শ্রেণির পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে।
৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনধারী: যাদের মাসিক পেনশন ৪০ হাজার টাকার ওপরে, তাদের ক্ষেত্রে প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
আগামী অর্থবছরে পেনশন খাতে ঠিক কতটুকু বরাদ্দ ও সুবিধা কার্যকর করা সম্ভব হবে, তা এখন চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।