এসএসসির খাতা পুনর্মূল্যায়ন: শাস্তি পাচ্ছেন ‘ওভার-আন্ডার নাম্বার’ দেওয়া শিক্ষকরা


এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে ‘পুনর্মূল্যায়ন নীতিমালা’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ নীতিমালার আওতায় খাতা মূল্যায়নে অতিরিক্ত বা কম নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে পরীক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নির্ধারণ করা হবে ‘অনুচিত নম্বর’। ওই সীমার বাইরে নম্বর দেওয়া পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পাবলিক পরীক্ষাগুলোর মূল দায়িত্বে থাকা আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা করেছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দুয়েক দিনের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি উপস্থাপন করবেন বোর্ডের কর্মকর্তারা।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেত পাওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে পুনর্মূল্যায়ন নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু হবে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

‘অনুচিত নম্বর’ নির্ধারণ করবে নীতিমালা কমিটি

প্রস্তাবিত নীতিমালায় শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতায় দেওয়া নম্বরের ক্ষেত্রে একটি ‘অনুচিত নম্বর’ নির্ধারণ করা হবে। পরবর্তীতে কোন কোন পরীক্ষক ওই সীমার মধ্যে অনুপযুক্তভাবে নম্বর দিয়েছেন, তা চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে পরীক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে ‘ওভার নাম্বারিং-আন্ডার নাম্বারিং’-এর ক্ষেত্রে যেসব শিক্ষকের ত্রুটি রয়েছে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।

আরও পড়ুন: এইচএসসির ফলাফল প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা

তিনি জানান, আগামীকাল বুধবার শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি জানানো হবে। এরপর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ‘পুনর্মূল্যায়ন নীতিমালা’ তৈরির জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে।

অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান আরও বলেন, নীতিমালা প্রণয়নকারী কমিটি একটি ‘অনুচিত নম্বর’ নির্ধারণ করবে। পরবর্তীতে কোন কোন শিক্ষক ওই অনুচিত নম্বর দিয়েছেন, তা চিহ্নিত করে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।

তবে ‘অনুচিত নম্বর’ কত হতে পারে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নীতিমালা কমিটিই এ নম্বর নির্ধারণ করবে। কোন সংখ্যাকে অনুচিত নম্বর হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তা আলোচনা ও যাচাই-বাছাই শেষে নির্ধারণ করা হবে।

ত্রুটি প্রমাণিত হলে ৫ বছরের শাস্তির মুখে পরীক্ষকরা

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে ‘ওভার নাম্বারিং-আন্ডার নাম্বারিং’-এর অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোনো শিক্ষকের ত্রুটি বা অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ৫ বছরের শাস্তির মুখে পড়তে পারেন।

তবে শাস্তির বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে শিক্ষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে, গত ৭ জুলাই জাতীয় সংসদে অনুমোদিত সংশোধিত পাবলিক পরীক্ষা আইনে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল বা মেধাতালিকায় হ্যাকিং কিংবা অবৈধভাবে পরিবর্তন করাকে ‘ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন’ নামে নতুন অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

পাশাপাশি পাবলিক পরীক্ষায় সংগঠিতভাবে পরীক্ষা জালিয়াতি করা বা এ ধরনের চক্র গঠন করলেও কঠোর শাস্তি ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

মন্ত্রিসভা ‘দ্য পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্সেস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’-এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোনো শিক্ষকের ত্রুটি বা অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ৫ বছরের শাস্তির মুখে পড়তে পারেন বলে জানা গেছে।

‘ওভার-আন্ডার নাম্বারিং’ করা পরীক্ষকদের তালিকা হচ্ছে

চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে যেসব পরীক্ষক ‘ওভার নাম্বারিং-আন্ডার নাম্বারিং’ করেছেন, তাদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলো তালিকা প্রস্তুত করছে। অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ইতোমধ্যে এ ধরনের একটি তালিকা তৈরির কাজ করছে।

এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৮ লাখের বেশি শিক্ষার্থী

গত ১০ আগস্ট দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে।

এরপর ১১ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়। এ সময় মোট ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ জন পরীক্ষার্থী পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করে। আবেদনকারীদের মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীও ছিল।

এর পরিপ্রেক্ষিতেই উত্তরপত্র মূল্যায়নে ‘ওভার নাম্বারিং-আন্ডার নাম্বারিং’ বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ নেয় আন্তঃশিক্ষা বোর্ড। অভিযুক্ত শিক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে নির্ভুলতা বজায় রাখার লক্ষ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।