শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি) এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা পুনরায় চালুর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) দুপুর দেড়টার দিকে রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।
সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, কেন্দ্র সচিবরা মূলত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকের ভূমিকায় থাকেন। পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের কোনো ভুলত্রুটি হলে তা কীভাবে সামাল দিতে হয়, সে বিষয়ে তারা প্রশিক্ষিত এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা তাদের রয়েছে।
কারিকুলাম পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি জানান, এ নিয়ে কাজ করতে বিশেষজ্ঞদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিনি নিজেও গতকাল থেকে পুরো বিষয়টি সরাসরি তদারকি শুরু করেছেন।
এইচএসসি পরীক্ষা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, পরীক্ষার সময় কিছুটা পেছানো হয়েছে। তবে নতুন সময়সূচি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই রুটিন প্রকাশ করা হবে এবং তা ইতিবাচক হবে।
এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালেও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছিল এবং চলতি বছরেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। তার মতে, করোনার পর থেকেই এ ধারা শুরু হয়। মাঝখানে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও গতবার এবং এবার আবারও সংখ্যা কমেছে। তবে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়বে বলেই তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষার বিস্তারিত
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একসময় গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতো প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি) ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা। শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট স্তরে মূল্যায়নের লক্ষ্যে চালু হওয়া এই দুটি পাবলিক পরীক্ষা দীর্ঘ সময় ধরে দেশের শিক্ষা কাঠামোর অংশ ছিল। তবে সময়ের পরিবর্তন, নতুন শিক্ষানীতি এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে শেষ পর্যন্ত এই পরীক্ষাগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
আরও পড়ুন: এসএসসি পরীক্ষা ২০২৬ এর নীতিমালা প্রকাশ, মানতে হবে যেসব নিয়ম
প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের জন্য ২০০৯ সালে পিএসসি পরীক্ষা চালু করা হয়। এর মাধ্যমে পঞ্চম শ্রেণি শেষে শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা যাচাই করা হতো। দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একযোগে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো, যা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম বড় পাবলিক পরীক্ষার অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচিত ছিল। পিএসসি চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং সার্বিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে আরও সুসংগঠিত করা।
অন্যদিকে, মাধ্যমিক স্তরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের জন্য ২০১০ সালে জেএসসি পরীক্ষা চালু হয়। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য এই পরীক্ষা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তাদের পরবর্তী শিক্ষাজীবনের ভিত্তি তৈরি করতে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হতো। জেএসসি পরীক্ষাও দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের আওতায় একযোগে অনুষ্ঠিত হতো এবং এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা রাখত।
করোনার কারণে পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা বন্ধ
২০২০ সালে বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে ওই বছর পিএসসি ও জেএসসি—দুই পরীক্ষাই অনুষ্ঠিত হয়নি। দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর প্রয়োজন দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিই পরবর্তীতে শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের পথ তৈরি করে।
এর ধারাবাহিকতায় সরকার নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়, যেখানে মুখস্থভিত্তিক পরীক্ষার পরিবর্তে ধারাবাহিক ও সামগ্রিক মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২২ সালে পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়। ফলে দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে চালু থাকা এই দুটি পাবলিক পরীক্ষার সমাপ্তি ঘটে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নতুন কারিকুলামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, দক্ষতা এবং বাস্তবমুখী শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে আলাদা পাবলিক পরীক্ষার পরিবর্তে স্কুলভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হবে।
সব মিলিয়ে, পিএসসি পরীক্ষা ২০০৯ সালে এবং জেএসসি পরীক্ষা ২০১০ সালে শুরু হয়ে ২০২০ সালের পর বন্ধ হয়ে যায়, এবং ২০২২ সালে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হয়। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তনের ইতিহাসে এই দুটি পরীক্ষার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, নতুন যুগের শিক্ষার চাহিদা মেটাতে এখন ভিন্ন পদ্ধতিই গুরুত্ব পাচ্ছে।